বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়াম বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাস, অর্জন ও গৌরবময় অধ্যায়ের স্মারকস্বরূপ একটি আধুনিক জাদুঘর।এটি কেবল একটি জাদুঘর নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাস—যেখানে অতীতের গৌরব, প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা একসাথে মিশে গেছে। এটি ঢাকার বিজয় স্মরণীতে অবস্থিত এবং এটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
ম্যাপে এখনো আগের নামটাই শো করছে। লোকাল গাইড ও কানেক্ট মডারেটরদের কাছে বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর নামকরণের আবেদন জানাচ্ছি।
নামকরণ ও ইতিহাস
এই জাদুঘরটি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। এর উদ্দেশ্য ছিল—দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সেনাবাহিনীর গঠনের ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবদানের চিত্র জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা।
পরবর্তীতে, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এটিকে সম্পূর্ণ আধুনিকভাবে পুনর্নির্মাণ করে নতুন জায়গায় (বিজয় সরণি) স্থানান্তর করা হয় এবং ২০২২ সালে এটি আবার উদ্বোধন করা হয়।
- ১৯৮৭ সালে প্রথম সামরিক জাদুঘরটি বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়
- ১৯৯৯ সালে জাদুঘরটি স্থায়ীভাবে বিজয় সরণিতে স্থানান্তর করা হয়।
- ২০০৯ সালে জাদুঘরটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
- ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা **বঙ্গবন্ধু সামরিক জাদুঘর ** নামে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন।
- ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জাদুঘরটির নাম আবার আগের নামে (বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়াম) ফিরিয়ে আনে কর্তৃপক্ষ।
এটি একটি অসাধারণ আধুনিক মিউজিয়াম— যেখানে আসল যুদ্ধের ট্যাংক ও আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ভরপুর। শিশু থেকে শুরু করে ইতিহাসপ্রেমী সবার জন্যই হতে পারে একটি শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা
দর্শনীয় বিষয় ও গ্যালারিগুলো:
স্বাধীনতা যুদ্ধ গ্যালারি
- মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ, পরিকল্পনা ও বিজয় অভিযান।
- শহীদ সেনাদের স্মরণে রাখা চিত্র ও নিদর্শন।
সশস্ত্র বাহিনীর বিবর্তন
- ব্রিটিশ–পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে আধুনিক সেনাবাহিনী পদক, ব্যাজ, ইউনিফর্ম, ব্যানার।
ট্যাংক, বিমান, ও যুদ্ধ যান
- বাস্তব যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, কামান, ট্যাংক—সবই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
- “Walk-through experience” যেখানে আপনি সরাসরি যানবাহনের ভেতর দেখতে পারেন।
ইন্টার্যাক্টিভ গ্যালারি ও থ্রি-ডি শো
- ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR), মাল্টিমিডিয়া ডিসপ্লে, ও সেনা অভিযানের 3D উপস্থাপনা।
- ডিজিটাল স্ক্রিনে 3D যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
UN Peacekeeping Mission গ্যালারি
- বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ ও অর্জনসমূহ।
এক নজরে মিউজিয়ামের ফ্লোর সমূহ
Basement (Navy Gallery): সাবমেরিন ও শিপ ব্রিজ সিমুলেটর
Ground Floor: সম্মান প্রদর্শন ও তোশাখানা জাদুঘর
2nd Floor (Army): ট্যাঙ্ক, অস্ত্র ও ইউনিফর্ম
3rd Floor (Air Force): বিমানে অভিজ্ঞতা—ইঞ্জিন, রাডার
4th Floor: UN Peacekeeping & CHT মিশন দৃশ্য
এছাড়াও রয়েছে—
3D Art Gallery: মিরর মেজ ও ট্রিক আর্ট (আলাদা টিকিট কাটতে হবে,)
Star Cineplex: 2D/3D সিনেমা দেখতে পারবেন (আলাদা টিকিট কাটতে হবে)
Basement (Navy Gallery)
নৌবাহিনীর ৫ ০০০ বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে ভিজিটররা এ ম্যাজিক ফিঙ্গারে নৌ-জাহাজের মডেল, হোলোগ্রাফিক শ্রদ্ধাঞ্জলি, রিমোটবোট ও সাবমেরিন।
- ওয়াকথ্রু এবং শিপ ব্রিজ সিমুলেটর অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন ।
- শিশুদের জন্য রয়েছে ভার্চুয়াল অ্যাকুয়ারিয়াম ও নেভাল গেম জোন।
- প্রাচীন ও আধুনিক জাহাজের মডেলগুলো দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
ভার্চুয়াল ভিডিয়োর মধ্যে এই
ভিডিয়োটি আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে
Ground Floor (ইতিহাস ও তোশাখানা জাদুঘর):
মিউজিয়ামে প্রবেশ করলেই দেখা মিলে গ্রাউন্ড ফ্লোরের।
- প্রধান এন্ট্রি হলে রয়েছে বাংলাদেশ সামরিক ইতিহাসের সমন্বিত গ্যালারি।
- তোশাখানা জাদুঘর— রাষ্ট্রনায়কদের প্রাপ্ত উপহার ও স্মৃতিচিহ্ন প্রদর্শনী।
- চারপাশে সুন্দরভাবে সাজানো তথ্য-প্রমাণ ও আরামের স্থান মিউজিয়াম অভিজ্ঞতা সুন্দর করে তোলে।
2nd Floor (Army Gallery)
এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্ত্র, ট্যাংক, যন্ত্রপাতি ও ইউনিফর্ম ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ওপারেশন, অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ, জিপ, কামান, হাসপাতাল পটভূমি এবং গৃহীত পদকের সংগ্রহ রয়েছে।
- ট্যাংক, কামান, বুলেটপ্রুফ ভেহিকল।
- অপারেশন, চিকিৎসা শিবির, পদক, ও ইউনিফর্ম।
- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অভিযানের সাজানো ইতিহাস প্রাণবন্ত ছিলো।
- ট্যাংক, কামান, অস্ত্র, হেলমেট ও গিয়ার।
- সেনাবাহিনীর মেডিকেল ও যোগাযোগ বিভাগ কেমন ছিল, তাও দারুণভাবে দেখানো হয়েছে।
3rd Floor (Air Force Gallery)
বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, রাডার, বিমান ইঞ্জিন এবং ইউনিফর্ম বিবেচনামূলকভাবে সাজানো হয়েছে।
- Fighter jet, Radar, Engine cut-section
- বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিভিন্ন মিশন ও অর্জন নিয়ে চমৎকার মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা।
- বিমান বাহিনীর ইউনিফর্ম থেকে শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন মিশনের গ্রাফিক্স।
- যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও বিমান চালকের গিয়ার।
- ড্রোন, মিসাইল ও ইন্টার্যাক্টিভ ডিসপ্লে দিয়ে ভিজিটরদের জন্য প্রদর্শন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ডকুমেন্টেশন এবং মানবিক সহায়তার ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন।
- জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশ্বজয়ের গল্প।
- চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস নিয়ে করা অপারেশন ও শান্তিচুক্তির নিখুঁত উপস্থাপনা।
এছাড়াও রয়েছে—
3D Art Gallery
বাংলাদেশে প্রথম এবং বৃহত্তম 3D ইলিউশন আর্ট গ্যালারি। এটি একটি আলাদা অংশ, যার জন্য আলাদা টিকিট প্রয়োজন।
- এতে রয়েছে মিরর মেজ, ডুডল ওয়ার্ল্ড, ট্রিক আর্ট—ফটোসেশন ও ফানিংয়ের জন্য চমৎকার স্থান।
- Mirror Maze, Trick Art, Doodle World সহ একাধিক থিমে সাজানো।
- যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন তাদের জন্য এটা বেশ পছন্দের যায়গা হবে।
Star Cineplex
মিলিটারি মিউজিয়ামের অভ্যন্তরে সিনেমা হল!
- ১৮০ আসনের আধুনিক সিনেমা হল।
- 2D ও 3D সিনেমা প্রদর্শন।
- আরামদায়ক সিট, সাউন্ড দারুণ, আর পরিবেশ ও ভালো
প্রত্যেকটি গ্যালারি শুধু দেখার নয়, অনুভবের জন্য বানানো।
সময়ের কারণে আমি স্টার সিনেপ্লেক্স ও 3D Art World ঘুরে দেখতে পারিনি। তাই এখানে আসলে যথেষ্ট সময় নিয়ে আসবেন।
টিকিট মূল্য: **
শুধুমাত্র মিউজিয়াম গ্যালারির জন্য—
- বাংলাদেশী সবার জন্য ১০০ টাকা (৫ বছরের নিচে শিশুদের টিকেটের প্রয়োজন নেই।
- সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৩০০ টাকা।
- সার্কভুক্ত দেশের বাহিরের সবার জন্য ৫০০ টাকা।
- 3D Art Gallery এবং Star Cineplex এর জন্য আলাদাভাবে টিকিট ক্রয় করতে হবে।
অনলাইনেও টিকিট কাটার সুযোগ রয়েছে।
কেন এখানে আসবেন?
- তথ্য ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা
- ইতিহাস, যুদ্ধ ও শান্তি—সবকিছু এক জায়গায়
- পারিবারিক ও শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য একদম উপযোগী
যাতায়াত ও সুবিধাসমূহ:
- বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি বা রিকশায় করে সহজেই পৌঁছানো যায়।
- পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা
- নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- বিশ্রামাগার ও ক্যান্টিন
- ফটো কর্নার
সতর্কতা : এখানে বড় ব্যাগ,গ্যাসলাইট ও বাহিরের খাবার নিয়ে যাওয়া নিষেধ। আপনাকে কয়েকবার চেকিং করার পর ভিতরে প্রবেশ করানো হবে। এখানে ভিডিও করাও নিষেধ রয়েছে। শুধু মাত্র ছবি তুলা যাবে। কিছু যায়গায় ছবি তুলাতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এখানে আসার আগে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে আসবেন। কেননা, পুরোটা ঘুরে দেখার জন্য অনেক সময় প্রয়োজন, তাড়াহুড়ো করে ঘুরে তেমন কিছু জানতে পারবেন না এবং আনন্দ ও পাবেন না। কমপক্ষে ২ ঘন্টা হাতে নিয়ে পুরোটা ঘুরে দেখবেন।
বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়াম শুধু একটি জাদুঘর নয়, এটি একটি প্রজন্মের শিক্ষা কেন্দ্র—যেখানে আমরা নিজের ইতিহাস, গৌরব আর আত্মত্যাগ একসাথে দেখতে পাই। যদি আপনি কখনো ঢাকায় আসেন, তাহলে এই মিউজিয়াম ঘুরতে মিস করবেন না।
লিখাটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে তারজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
#LocalGuides #Bangladesh #3DArtMilitaryMuseum #MilitaryMuseum
কানেক্ট ফোরামে আমার অন্যান্য পোস্ট, আশা করি ভালো লাগবে।![]()

































































