কিছু ভ্রমণ থাকে যা শুধু চোখে দেখা নয়, বরং হৃদয়ে গেঁথে থাকে। ঠিক তেমনই এক অভিজ্ঞতা হলো আমার সাজেক ভ্যালি ভ্রমণ। পাহাড়, মেঘ, সংস্কৃতি আর স্বাদের অনন্য এক মেলবন্ধন ছিল এই যাত্রা। চলুন, আপনাদের আমার চোখে দেখা সাজেকের গল্প শোনাই।
মেঘের রাজ্য সাজেক
আমরা যখন সাজেকে পৌঁছাই, তখন ছিলো প্রখর রোদ। সাজেকের কটেজগুলো থেকে ভারতের মিজোরামের পাহাড়গুলো খুব ভালোভাবেই দেখা যায়। মিজোরামে তখন বৃষ্টি পড়ছিলো যা বাংলাদেশ থেকে দেখা যাচ্ছিলো। এর কিছুক্ষণ পরে সাজেকের পাহাড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। চারপাশে জমা হলো প্রচুর মেঘ। প্রকৃতি আমাদের এক অনন্য উপহার দেয়—মেঘের ছোঁয়া। চোখের সামনে দিয়ে ভেসে চলা সাদা মেঘ, আর পাহাড়ের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া কুয়াশা এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছিল। ছবি তোলার জন্য এটি ছিল একদম আদর্শ সময়।
সাজেক ভ্রমণের কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান:
লুসাই গ্রাম (Lusai Village) – এখানকার লুসাই আদিবাসীদের জীবনধারা ও রঙিন ঘরবাড়ি দেখে মন ছুঁয়ে গেছে!!
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ২০২৪ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী লুসাই গ্রাম ভ্রমণ করেন।
সাজেকের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত লুসাই গ্রাম, মূলত লুসাই আদিবাসীদের বসতি। বর্তমান লুসাই গ্রামে মানুষ নেই, কিন্তু গ্রামটি রয়ে গেছে যা দেখতে ভ্রমণপ্রিয় মানুষের ভিড় করে থাকে। লুসাই গ্রামটি সাজেকের সবচেয়ে শান্ত ও নিরিবিলি একটি স্থান। এখান থেকে ভারত(মিজোরাম) সীমান্তের পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যায়। লুসাই গ্রামের কিছু সৌন্দর্য;
- রঙিন কাঠের ঘরবাড়ি
- আদিবাসী সংস্কৃতি ও পোশাক
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নীরবতা
রুইলুই পাড়া (Ruilui Para) – সাজেকের প্রাচীন ও মূল বসতি, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে উপভোগ করা যায়।
এটি সাজেক ভ্যালির উল্লেখযোগ্য বসবাসের স্থান। যেখানে বসবাস করেন বিভিন্ন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ। রুইলুই পাড়ার ঘরবাড়িগুলো বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি এবং প্রাকৃতিকভাবে সাজানো। রুইলুই পাড়াতে সাজেকের অধিকাংশ কটেজ ও রিজোর্টগুলো গড়ে উঠেছে। এখানে রয়েছে —
- শত বছরের পুরনো আদিবাসী জীবনযাত্রা
- সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খাবার
- হোমস্টে ও কটেজ ব্যবস্থা
- বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মিলনস্থল
রুইলুই পাড়ায় অবস্থিত কিছু স্থানীয় দোকান। যেখানে পাওয়া যায় পাহাড়ি মানুষদের হাতে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী
সাজেক হেলিপ্যাড (Sajek Helipad) – এখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য এক কথায় অনবদ্য!
এটি সাজেকের অন্যতম জনপ্রিয় স্থান, যেখানে থেকে চারদিকে পাহাড়, মেঘ আর সূর্যের খেলা উপভোগ করা যায়। সকালে সূর্যোদয়, দুপুরে মেঘের ভেলা, আর বিকেলে সূর্যাস্ত—সবই এখান থেকে দেখা যায়। সাজেক হ্যালিপাড যে কারণে জনপ্রিয়—
- ফাঁকা চত্বর, ওপেন ভিউ
- ছবি তোলা ও ড্রোন ফুটেজের জন্য আদর্শ
- স্থানীয়দের আড্ডা ও পর্যটকদের ভিড়
- সামরিক হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার জন্য ব্যবহৃত
সাজেক মসজিদ (Sajek Mosque) – পাহাড়ের কোলঘেঁষে নির্মিত নান্দনিক ও সুন্দর একটি মসজিদ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে একটি শান্তিপূর্ণ উপাসনালয়। মুসলিম পর্যটকদের জন্য সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নামাজের স্থান। এই মসজিদটি সাজেকের প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মিশে আছে একেবারে নিঃশব্দভাবে। মুসলিম পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য এটি একটি পবিত্র স্থান। এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য:
- পাহাড়ি পরিবেশে শান্তিপূর্ণ নামাজের সুযোগ
- পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত ও আশপাশে সবুজ গাছগাছালি
- মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি
কংলাক পাহাড় (Konglak Hil) – সাজেকের সবচেয়ে উঁচু জায়গা, যেখান থেকে পাহাড় ও মেঘের মিতালি দেখতে পাওয়া যায়।
সাজেকের সবচেয়ে উঁচু স্থান এটি। এখান থেকে পুরো সাজেক, লুসাই গ্রাম এমনকি ভারতের কিছু অংশও দেখা যায়। কংলাক যাওয়ার পথটিই এক নিজস্ব অ্যাডভেঞ্চার, কিছুদূর গাড়িতে যাওয়ার পর হেঁটে হেঁটে উপরের দিকে যেতে হয়। মূলত মানুষ এখানে সূর্যাস্ত দেখার জন্য কংলাক পাহাড়ে আসে। কংলাক পাহাড়ের সৌন্দর্যের কারণ:
- সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের অসাধারণ দৃশ্য
- পাহাড়ি বাতাস ও মেঘের ছোঁয়া
- ট্রেকিংয়ের জন্য জনপ্রিয়
- ছবি তোলার আদর্শ লোকেশন
খাবারের স্বাদ:
ভ্রমণের সময় আমি কিছু দারুণ স্থানীয় খাবার উপভোগ করেছি। সাজেকে গিয়ে না খেলে মিস করবেন।
ব্যাম্বো বিরিয়ানি: বাঁশের খোলসে রান্না করা বিরিয়ানি, যার সুগন্ধ আর স্বাদ অন্যরকম।
ব্যাম্বো টি (চা): এক কাপ ব্যাম্বো টি মেঘে ঢাকা বিকেলে যেন আরাম আর প্রশান্তির চূড়ান্ত অনুভূতি। পাহাড়িরা বাশের মধ্যে করে চা বিক্রি করে যার মূল্য মাত্র ৩০৳।
তাছাড়া রয়েছে চিকেন বিবিকিউ, খিচুড়ি ও অন্যান্য খাবার। এখানের হোটেলগুলোতে ম্যাকেজ আকারে খাবার বিক্রি করে।
শত সৌন্দর্যের মধ্যে একটি দুঃখের বিষয় হলো ৬/৭ মাস আগে সাজেকে আগুন লেগে বেশ কয়েকটি পর্যটক রিজোর্ট পুড়ে যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
কীভাবে সাজেকে যাবেন?
সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশে অবস্থিত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায়, কিন্তু যাতায়াত সাধারণত খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হয়।
সাজেকে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে খাগড়াছড়ি শহরে।
সেখান থেকে জিপ গাড়ি বা মাহিন্দ্রা নিয়ে দীঘিনালা হয়ে সাজেক যেতে হয়।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক পর্যন্ত ২-৩ ঘণ্টার পাহাড়ি পথ, যা পাড়ি দিতে হয় মাহিন্দ্রা বা জিপ গাড়িতে (চাঁদের গাড়ি)। আপনি চাইলে আপনার ব্যক্তিগত গাড়িও নিয়ে যেতে পারেন। যেমন: কার, মোটরসাইকেল।
বাগাইহাট আরমি ক্যাম্প হতে পুলিশ ও আর্মির স্কোয়াটে করে যেতে হয়ে। সাজেক থেকে আসার সময় ও সেইমভাবে আসতে হবে।
প্রত্যেকদিন দুটো স্কোয়াট বাগাইহাট হতে ছেড়ে যায়; সকাল ১০:৩০ ও দুপুর ২:৩০ মিনিটে।
ছবি: বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প
এই ছিলো আমার সাজেক ভ্যালি ভ্রমণের ছোট্ট গল্প। আপনি যদি এখনো সাজেক না গিয়ে থাকেন, তাহলে বলবো – অন্তত একবার হলেও মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যান। আর দেখুন স্রষ্টার অপরূপ সৌন্দর্য।
কানেক্ট ফোরামে আমার অন্যান্য পোস্ট:

























