রেং ত্লাং পর্বতসারি!

মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে রেংত্লাং পর্বতসারি !

দুমলং হলো বাংলাদেশের (তৃতীয়) উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ!

মাইথাই জামা হাফং বাংলাদেশের (ষষ্ঠ) সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ

মুখরা থুতাই হাফং হলো বাংলাদেশের ( অস্টম ) উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ।

কাপিটল চূড়া (বা কপিতাল) হলো বাংলাদেশের (এগারো ) উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ।

আমি আজ শেয়ার করবো আমার এখানে পোঁছানোর (গল্প)

আমি আর আমার বন্ধু প্রথমে মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট ভ্রমণে যাই। সেখানে টানা চার–পাঁচ দিন ঘুরে বেড়ানোর পর আলীকদমে ফিরে আসি। পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকে সরাসরি ঢাকায় ফিরে যাব। কিন্তু হঠাৎ করেই রেংত্লাং পর্বতসারির কথা মাথায় চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই ঢাকা ফেরার পরিকল্পনা বাতিল করে নতুন অভিযানের সিদ্ধান্ত নিই।

বাজার থেকে আলু, পেঁয়াজ, মসলা, নুডলস, কাপ নুডলস এবং অতিরিক্ত মসলা কিনে নিলাম। সব মিলিয়ে আমাদের দুজনের ব্যাগের ওজন প্রায় ৪০ কেজিরও বেশি হয়ে গেল।

ততক্ষণে বিকেল প্রায় পাঁচটা বেজে গেছে। আমরা একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করি, তবে সেটি আসতে কিছুটা দেরি হয়। এরপর ২৬ কিলো ক্যাম্প চেকপোস্টে পৌঁছে আইডি কার্ড জমা দিই। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ছয়টার পর পর্যটকদের থানচিতে প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় প্রথমে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। অনেক অনুরোধের পর কর্তৃপক্ষ বিশেষ অনুমতি দিলে আমরা দ্রুত রওনা হই এবং রাত আটটার দিকে ১০ কিলো এলাকায় পৌঁছে সেখানেই রাত কাটাই।

পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নুডলস খেয়ে যাত্রা শুরু করি।

সরাসরি পাহাড় বেয়ে নেমে ঝিরিপথ ধরে হাঁটতে থাকি। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল দুপুরের আগেই চিংলক পাড়ায় পৌঁছানো।

ঝিরিপথ

দুই–তিন ঘণ্টা হাঁটার পর বাসিরাম পাড়ার জুম পার হয়ে চিংলক পাড়ার কাছাকাছি পৌঁছাতেই বিজিবির টহল দলের মুখোমুখি হই।
মুহূর্তেই আমরা ভয় পেয়ে যাই। তবে তারা কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি।
বরং বুঝিয়ে আমাদের ফিরে যেতে বলেন। আমরা কিছুটা পথ ফিরে এসে বিশ্রাম নেওয়ার ভান করি।
তখন তারা বলে তোমরা কিছুক্ষণ রেস্ট নাও,রেস্ট নিয়ে আমাদের পিছন পিছন আসো আমরা সামনে আগাচ্ছি ,
সে বলে তারা হাঁটা শুরু করে দিল এবং তারা কিছু দূর যাওয়ার পরে আমরা আবার চিংলক পাড়ার দিকে দৌড় শুরু করি :face_with_peeking_eye:

চিংলক পাড়া

আগেই বলেছিলাম, আমাদের গন্তব্য ছিল চিংলক পাড়া। তবে সেখানে আবার টহল দলের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই বিকল্প পথ খুঁজলেও কার্যকর কোনো বাইপাস ছিল না। শেষ পর্যন্ত পাড়ার ভেতর দিয়েই পাহাড়ে উঠে জুম পার হয়ে কপিতাল পাহাড়ের নিচের লাচিং পাড়ার ডাউন ঝিরিতে পৌঁছাই। তখন দুপুর প্রায় দেড়টা।

ঝিরিতে বসে চিড়া, মিঠাই ও স্যালাইন খেয়ে ১৫–২০ মিনিট বিশ্রাম নিই। এরপর লাচিং পাড়ার উদ্দেশ্যে আবার হাঁটা শুরু করি। সেদিন প্রচণ্ড গরম ছিল—তাপমাত্রা প্রায় ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লাচিং পাড়া একেবারে খাড়া পাহাড়ের ওপর হওয়ায় উঠতে আমাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। বিশ্রাম নেওয়ার মতো ছায়াও ছিল না; রোদের মধ্যেই কয়েকবার বসে শক্তি সঞ্চয় করতে হয়েছে।

রোদের মধ্যেই বসে আছি :joy:

অবশেষে বিকেল চারটার দিকে লাচিং পাড়ায় পৌঁছাই। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে একটি মুরগি কিনে রান্না করি। এরপর আমাদের রুমের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে রাতের খাবার খাই। রাত আটটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি।

লাচিং পাড়ায় :winking_face_with_tongue:

পরদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে বাংলাদেশের ১১তম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কপিতালের উদ্দেশ্যে রওনা হই। চূড়ায় উঠে কিছুক্ষণ ছবি !

মাউন্ট ক্যাপিটাল

ছবি তুলে বিপরীত দিক দিয়ে নেমে থাইক্কীয়াং পাড়ার পথে যাত্রা শুরু করি। সকাল ১১টার দিকে সেখানে পৌঁছে আলু ভর্তা, ডাল আর ভাত খেয়ে মাত্র ১০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করি।

কিছুদূর এগিয়ে ডাবল ফলস ঝর্ণার পাশ দিয়ে যেতে হয়। ঝর্ণাটি দেখার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল রেংত্লাং, তাই সেখানে নামিনি। মনটা খারাপ হলেও সামনে এগিয়ে যাই।

মিনি ডাবল ফলস :winking_face_with_tongue:

প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর ক্রেইকুং টাউংয়ের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা পথ হারিয়ে ফেলি। যত সামনে এগোচ্ছিলাম, জঙ্গল ততই ঘন হচ্ছিল। প্রায় ঘণ্টা সময় নষ্ট করে আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে অন্য একটি পথ খুঁজে পাই।

সেই পথ ধরে কঠিন ট্রেকিং করতে করতে অবশেষে এসম পাড়ায় পৌঁছাই। কিন্তু সেখানে রাত কাটানোর অনুমতি পাইনি। স্থানীয়রা জানালেন, আমাদের রাখলে তাদের প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হতে পারে। পানি খেয়ে সেখান থেকে হাতিছড়া পাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। সেখানেও একই পরিস্থিতি। সেদিন সেনাবাহিনীর টহল থাকার কারণে তারাও আমাদের রাখতে পারেননি। তবে তাদের আন্তরিকতা ও ব্যবহার সত্যিই মনে রাখার মতো ছিল।

কোনোমতে রাত পার করে ভোরেই হাতিছড়া পাড়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। পুরো অভিযানের পরিকল্পনা আমরা আগে থেকেই অফলাইন ম্যাপ ও জিপিএসের সাহায্যে করে রেখেছিলাম।

এরপর ঝিরিপথ ধরে নেমে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছে তিনমুখ পিলারের কাছে কিছুক্ষণ ছবি তুলি। সেখান থেকে মুখরাথুথাই হাফংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। মাঝপথে আমার জিপিএস ঠিকমতো কাজ করছিল না। সামিট পয়েন্টে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পানি খেয়ে আবার সামনে এগিয়ে যাই। এরপর মাইথাইজামা হাফংয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে দূরে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পাই। তাই আমরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ নীরবে অপেক্ষা করি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার যাত্রা শুরু করি।

তিনমুখ পিলার

তিন মুখ পিলার পার হবার পরে জুক দরে ছিলো রাত পর্যন্ত রক্ত পরে ছিলো!

মুখরাথুথাই হাফং

মাইথাইজামা হাফংয়ের পথে

ঘন বাঁশঝাড় ভেঙে বিকেলের দিকে মাইথাইজামা হাফং পৌঁছাই। আর পরের দিন সফলভাবে ডুমলং সামিট সম্পন্ন করি।

মাইথাইজামা হাফং

এভাবেই পরিকল্পনার বাইরে শুরু হওয়া একটি সিদ্ধান্ত আমাদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিযানে পরিণত হয়। অসংখ্য কষ্ট, অনিশ্চয়তা, প্রচণ্ড গরম, ঘন জঙ্গল আর দীর্ঘ পথচলার পরও পাহাড়ের প্রতিটি মুহূর্ত আজও মনে গেঁথে আছে।

ট্রেইল এর কিছু ছবি !

{ধন্যবাদ লোকাল গাইড বাংলাদেশ}

10 Likes

অনেক সুন্দর হয়েছে, ছবি ও লোকেশন গুলোও দেখতে দারুন। তবে প্রশাসনের চোখ কে ফাকি দিয়ে না যাওয়াই ভালো, অনেক সময় অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে। @AdventureUnleashed

1 Like

ধন্যবাদ :hugs:

অনেক ইচ্ছা ছিলো! তাই সব ফাকি দিয়ে ঘুরে আসা😐

1 Like

@AdventureUnleashed ভাই জোক ছিল নাকি পথে?

1 Like

ভাইয়া এতো পরিমানে ছিলো যা বলার মতো না! :sob:

আপনার অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ, @AdventureUnleashed
আপনার ভ্রমণ কাহিনী শুনে আমার তো এখনই যেতে ইচ্ছে করতেছে, বাট কখনো যাওয়া হয় নাই, ইনশাআল্লাহ এরকম পাহাড় ট্রাকিং করব.

1 Like

ধন্যবাদ ভাইয়া!

শীতকালে সময় করে ঘুরে আসেন!

1 Like