সিকিম ভ্রমণ: দ্বিতীয় পর্ব

ঘুম ভাঙলো সকাল ৭ টায়। কখন যে রাত কেটে গেসে টেরই পাইনি। ফ্রেশ হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সকালের গ্যাংটক দেখার জন্য। এমজি মার্গে ঘুরে ঘুরে ছবি তুললাম। এমজি মার্গের দুপাশেই অনেক হোটেল রেস্টুরেন্ট পাবেন।আমরা একটি ইন্ডিয়ান খাবার হোটেলে ৪০ রুপি দিয়ে ছোলা আর পুরি এবং ১০ রুপি দিয়ে চা নিয়ে নাস্তা করেছিলাম। নাস্তা সেরে বের হয়ে পড়লাম ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। আজকে আমাদের প্ল্যান হচ্ছে গ্যাংটকের আসে পাশে ঘুরে দেখা। মনে রাখবেন আমরা সমতলে ঘুরতে আসি নাই। এটি একটি হাই আল্টিটিউড ট্যুর। আর যেহেতু বাচ্চা ছিল তাই আমরা গ্যাংটকে একদিন এক্লিমাইজেশন এর জন্য রাখি। এতে করে আমারদের শরীর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় পাবে।

আমরা যেহেতু ৮ জন তাই দুটো ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভারই আমাদের গাইড উনি আমাদের ৭ টা স্পট ঘুরে দেখাবেন। সবাই চলে আসলো এবার যাবার পালা। প্রথমেই আমাদের গাড়ি থামে একটি ঝর্ণার সামনে। সাইনবোর্ডে লেখা বাঁকথাং ওয়াটারফল। খুব সুন্দর ছোট একটি ঝর্ণা। নেমেই সবাই ছবি তোলাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। এখানে জিপ লাইনিং করা যায় ১০০ রুপিতে । আপনি চাইলে সিকিমের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ভাড়া নিয়ে পড়তে পারেন। অনেকেই ওই পোশাক পরে ছবি তুলছে। আধা ঘন্টা এখানে থেকে রওয়ানা দিলাম নেক্সট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

গাড়ি ২০ মিনিটের মধ্যে এসে থামলো একটি বৌদ্ধ মন্দিরের গেটে। আমরা হেটে ভিতরে ঢুকলাম। জায়গাটা সুন্দর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বানানো হয়েছে মনোরম দৃশ্য। প্রচুর ছবি তুললাম। ঘন্টা খানেক ছিলাম এখানে।

গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। কিসুক্ষন পর আমরা তাশি ভিউ পয়েন্টে আসলাম। এখন থেকে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে। সিঁড়ি দিয়ে ভিউ পয়েন্টের উপরে গেলাম। কাঞ্চনজংঘার ছবি তুললাম। জায়গাটা ভালোই। আসলে গ্যাংটক সিটির সবগুলা স্পট কাছাকাছি। তবে আধা ঘন্টার বেশি কোনোটাতেই থাকার মত না।

এরপর দেখার ছিল একটি ঝর্ণা কিন্তু পানি না থাকার কারণে আমরা সেখানে থামি নাই। চলে গেলাম আরেকটি ভিউ পয়েন্টে। এখন থেকে গ্যাংটক শহরটা দেখা যায়। এটির কোনো নাম জানতে পারলাম না। তবে জায়গাটা খাসা। সবাই অনেক ছবি তুললো।

এরপর আমাদের গন্তব্য গণেশ টক। বলে রাখা ভালো টক মানে মন্দির। ৩/৪ তলা উঁচুতে সবাই জুতো খুলে উঠছে। আমার ভালো লাগেনি তাই আমি উপরে যাইনি । আমি মন্দিরের গেইটে তাজা ফলের জুস্ এনজয় করতে লাগলাম। পাশেই দেখলাম একটি ভুতের বাড়ি। হাহা ভয় পাবেন না ১০০ রুপি টিকেট লাগে ভিতরে ঢুকতে। অন্ধকার গলি দিয়ে আপনাকে হেটে যেতে হবে। আর নানা ধরণের ভুতের আওয়াজ পাবেন। আসলে ভিতরে একজন ভুতের পোশাক পরে আপনাকে ভয় দেখতে চাইবে। খুবই রোমাঞ্চকর। আমার কাছে ভালোই লেগেছে। আপনাদের আশা করি ভালো লাগবে।

গণেশ টকের পাশেই ন্যাশনাল জু। এটা আমাদের প্যাকেজে ছিল না যদিও। আমরা এক্সট্রা টাকা দিয়ে ড্রাইভারকে রাজি করাই। টিকেট কেটে গাড়ি নিয়ে ভিতরে ঢুকতে হয়। প্রথমেই গেলাম ভাল্লুক দেখতে। চিড়িয়াখানাটা অনেক জায়গা নিয়ে কিন্তু পশু পাখি সীমিত। ভাল্লুকের পর গেলাম পাখির খাঁচার সামনে অনেক ধরণের পাখি ছিল। সেখান থেকে রেড পান্ডা, চিতাবাঘ, নীল গাই দেখে আমরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই গ্যাংটকে ফিরে আসি। সময় বেজে বিকেল ৩ টা। ক্ষুদায় পেট চোঁচোঁ করছে। গ্যাংটকে আসলাম ভাইয়ের মাটন বিরিয়ানি দিয়ে লাঞ্চ করলাম। গ্যাংটকে বেশ কিছু হালাল ফুডের দোকান পেয়ে যাবেন। তারমধ্যে অন্যতম এই আসলাম ভাইয়ের দোকান।

হোটেলে ফিরে আসি। বেশ ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় বের হবো। আজকে রাতের গ্যাংটক ঘুরে দেখবো। সন্ধ্যায় বের হলাম রেডি হয়ে বাহিরে মোটামুটি শীত পড়েছে। আজকের মধ্যেই আমাদের লাচুং যাবার ব্যবস্থা করতে হবে।
লাচুং নর্থ সিকিমের পড়েছে। গ্যাংটক থেকে সারাদিনের জার্নি। লাচুং যেতে হলে আপনাকে কোন একটি ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমেই যেতে হবে একা একা যেতে পারবেন না। লাচুং যেতে আলাদা পারমিশন লাগে। আমরা একটি ট্রাভেল এজেন্ট থেকে প্যাকেজে নিয়ে নেই। ২ দিন ১ রাতের প্যাকেজ, এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় প্যাকেজ । লাচুং আশা-যাওয়া, ১ রাতের হোটেলে থাকা, খাওয়া এবং ইয়ামথাং ভ্যালি ঘুরাসহ। সবাই ছবি, পাসপোর্ট এর ফটোকপি, আর ILP এর কপি দিলাম পারমিশন এর জন্য। কাল সকাল দশটায় আমাদের আসতে বললো।

গ্যাংটকে অনেক ট্রাভেল এজেন্ট আছে যারা লাচুং এর প্যাকেজ করে দিবে। আপনারা কয়েকটা ঘুরে তারপর দর-দাম করে নিবেন। আমরা প্যাকেজ নিয়ে বের হয়ে পড়লাম গ্যাংটক ঘুরার জন্য। রাতের এমজি মার্গ বেশ জমজমাট। আমরা অনেক হাটাহাটি করলাম, খেলাম। অনেকে শীতের পোশাক কিনলো। আমি একটি কান টুপি আর হাত মুজা কিনে নিলাম। রাত ১১ টা পর্যন্ত আমরা ঘুরাঘুড়ি করলাম। অবশেষে হোটেলে ফিরে এলাম । কাল কিন্তু অনেক জার্নি করতে হবে।

টিপস :[ লোকাল ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গ্যাংটক ঘোরার জন্য ট্যাক্সি পেয়ে যাবেন। আমরা চার হাজার রুপিতে দুটি ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। ৭টি স্পট ঘুরিয়ে আবার আমাদের এখানে নামিয়ে দিয়ে যাবে। আমরা বিশ হাজার রুপিতে লাচুং এর প্যাকেজ নিয়েছিলাম। পরে জিরো পয়েন্ট যেতে আরো চার হাজার রুপি এক্সট্রা দিতে হয়েছে। জিরো পয়েন্টটা কন্ডিশনাল কারণ বৈরী আবহাওয়ার কারণে, বরফ পরে, ল্যান্ড স্লাইডিং হয়ে রাস্তা বন্ধ থাকে। তাই ঐখানে গিয়ে যদি রাস্তা খোলা থেকে তাহলে আপনি যেতে পারবেন। ]

14 Likes

@MazharTraveler ভাই সুন্দর পোস্ট। অনেক তত্থ আছে।

1 Like

@rashedul-alam Thanks bhai

1 Like