রাজশাহী জেলার পূর্ব দক্ষিণে অবস্থিত ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য সমৃদ্ধ উপজেলার নাম বাঘা উপজেলা। উক্ত পোষ্টে আমার উপজেলা ও আশেপাশের দর্শনীয় স্থান সহ এ অঞ্চলের মুখরোচক সব খাবার সম্বন্ধে কিছু তথ্য জানাবো। যেগুলো আমার এলাকায় আসা দেশই বিদেশি লোকাল গাইডের মন কেড়ে নিবে সহজেই।
সংক্ষিপ্ত ইতিহা****সঃ জনশ্রুতি আছে, সুলতান নাসির উদ্দীন শাহ পদ্মা নদী দিয়ে ঢাকার বিদ্রোহ দমন যাচ্ছিলেন। পথে তার বাহিনী পেটের রোগে আক্রান্ত হন। তখন বাঘায় যাত্রা বিরতি দিয়ে নাসির উদ্দীন দেখেন, দুরে আগুণ দেখে এগিয়ে গেলে দেখতে পান, বাঘবেষ্টিত একজন সাধক ধ্যানে বসে আছেন। তখন তারা সাধক শাহ দৌলার কাছে তাদের অসুখের কথা বলেন। পরে শাহ দৌলার দেওয়া ওষুধ খেয়ে তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সে থেকে এই অঞ্চলকে বাঘা বলে আখ্যায়িত করা হয়।
উপজেলা সম্বন্ধে তথ্যঃ বাঘা উপজেলা আয়তন: ১৮৪.২৫ বর্গ কিমি। অবস্থান: ২৪°০৭´ থেকে ২৪°১৯´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°৪৪´ থেকে ৮৮°৫৫´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। সীমানা: উত্তরে চারঘাট ও বাগাতিপাড়া উপজেলা, দক্ষিণে দৌলতপুর উপজেলা (কুষ্টিয়া), পূর্বে লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পদ্মা (গঙ্গা) নদী।
দর্শনীয় স্থান সমূহঃ
১। দশ গম্বুজ বিশিষ্ট বাঘা শাহী মসজিদ
মসজিদ বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও প্রাচীন নিদর্শন। মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয়। মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি)হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ নির্মাণ করেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয়। মসজিদটি ২৫৬ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। সমভুমি থেকে থেকে ৮-১০ ফুট উঁচু করে মসজিদের আঙিনা তৈরি করা হয়েছে। উত্তর পাশের ফটকের ওপরের স্তম্ভ ও কারুকাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মসজিদটিতে ১০টি গম্বুজ আছে । আর ভেতরে রয়েছে ৬টি স্তম্ভ। মসজিদটিতে ৪টি মেহরাব রয়েছে যা অত্যন্ত কারুকার্য খচিত।মাঝখানের দরজার ওপর ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। মসজিদটির গাঁথুনি চুন-সুরকি দিয়ে। ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে। সর্বমোট ১০টি গম্বুজ, ৪টি মিনার (যার শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতির) এবং ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই মসজিদটি চারদিক হতে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রাচীরের দু’দিকে দু’টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদের ভিতরে-বাইরে সবর্ত্রই টেরাকোটার নকশা বর্তমান। সবখানেই টেরাকোটার নকশা। এছাড়া আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ ফার্সি খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম কারুকাজ। এছাড়া মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশেই রয়েছে হজরত শাহদৌলা ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার।২। বাঘা শাহি দিঘী
বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর পুত্র নাসিরউদ্দীন নসরত শাহ জনকল্যাণার্থে মসজিদের সামনেই একটি দিঘি খনন করেন। শাহি মসজিদ সংলগ্ন এ দিঘিটি ৫২ বিঘা জমির ওপর রয়েছে।
এই দিঘির চারপাশে রয়েছে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ। প্রতিবছর শীতের সময় এ দিঘিতে অসংখ্য অতিথি পাখির কলতানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে দিঘিটির চারটি বাঁধানো পাড় নির্মাণ করা হয়েছে।৩। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাচীন নারী মসজিদ, পাথর খচিত শিলালিপিঃ
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মোগল আমলের নারী মসজিদ। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এ মসজিদের স্থাপত্যরীতিতে মোগল ভাবধারার ছাপও সুস্পষ্ট। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ পথের মূল দরজায় ফারসি ভাষায় পাথরে খচিত শিলালিপি রয়েছে। ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের অবস্থান প্রায় ৩০ ফুট সুউচ্চ টিলার ওপর। বর্গাকার মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২৭ ফুট,প্রস্থ ১৩ ফুট। চারপাশের দেয়াল তিন ফুট ৬ ইঞ্চি চওড়া। উত্তর ও দক্ষিণ লম্বাকৃতির মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশ পথ। মসজিদের ইট ধূসর বর্ণের।
এ ইটের দৈর্ঘ্য ১০ ইঞ্চি, প্রস্থ ৬ ইঞ্চি এবং চওড়া দেড় ইঞ্চি। বর্তমান যুগের ইটের চেয়ে এর আকৃতি একেবারেই আলাদা। দর্শনার্থী ও নামাজিদের ওঠা নামার জন্য মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে প্রবেশ পথ।
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ পথের ওপরে ফারাসি ভাষায় পাথরে খচিত শিলালিপিটি চুরি হয়ে যায়। যারা এ চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল; কিছুদিন পর তাদের একজনের পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরে পাথরটি মসজিদের ভেতরে রেখে যায় সে। এরপরে আরও একজন একইভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। চিকিৎসায় পা কেটে ফেলেও ভালো হয়নি। পরে দুজনই মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের জীবদ্দশায় পাথর চুরির লোমহর্ষক ঘটনা তাদের মুখ দিয়েই বেরিয়ে আসে।
৪। বাঘা জাদুঘরঃ
হাজার বছরের পূরাকীর্তি ও মুসলিম স্থাপত্বের নিদর্শন দিয়ে সাজানো জাদুঘর। বাঘার ঐতিহাসিক শাহী মসজিদও বিশাল দীঘিকে ঘিরে আগত দর্শনার্থীদের পর্যটন সুবিধাবৃদ্ধি সহ অতীতের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বাঘার বিশাল দীঘির পশ্চিম পাড়েও হযরত শাহ আব্দুল হামিদদানি মন্দ(রহঃ)’র মাজারের উত্তর পার্শ্বে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জাদুঘর নির্মাণ করেন।
জাদুঘরের গেটের পাশেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার, জন প্রতিটিকেটর দাম পনের টাকা করে, তবে পাঁচ বছরের কম কোন বাচ্চার জন্যে টিকেট এর দরকার পড়েনা। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশ মুল্যে নির্ধারন করাহয়েছে ৫ টাকা। সার্কভুক্ত বিদেশি দর্শনার্থীর জন্যে টিকেট মূল্য পঞ্চাশ টাকা এবংঅন্যান্য বিদেশী দর্শকদের জন্য টিকেটের মূল্য দুইশত টাকা। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মাঝখানে দুপুর ১ টাথেকে ১.৩০পর্যন্ত আধঘণ্টার জন্যে বন্ধথাকে। সরকারী কোন বিশেষ দিবসে জাদুঘর খোলা থাকে।৫। আড়ানী ক্ষ্যাপার বাবার আশ্রমঃ
বাঘা উপজেলার ১৩ কিমি উত্তরে আড়ানীতে আছে ক্ষ্যাপা বাবার আশ্রম । খ্যাপা বাবা বা চটা বাবা এই আড়ানী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা। এই আশ্রমে এক সময় অনাথ – আতুর, ভক্ত-বৈষ্মব, ষাদ-সন্ন্যাসী, আউলিয়া,দরবেশ, ফকির অতিথি অভ্যাগত সকলেই আশ্রয় পেতেন এবং প্রসাদ পেয়ে ধন্য হতেন। আশ্রমে মন্দির সংলগ্ন একটি নিম গাছ আছে এবং একটি বেল গাছ দুই বন্ধুর মত দাড়িয়েঁ অছে। আশ্রমের পূর্বদিকে আম-কাঁঠালের বাগান, পশ্চিমদিকে কয়েকটি নরিকেলের গাছ, উত্তরে হলদার পাড়া।পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বড়াল নদী। আড়ানী হাটের উত্তর পাশেই বারোয়ারী কালীবাড়ী। ঐতিহ্যমন্ডিত এই কালী বাড়ীতে প্রতি বছর ভাদ্র মাসে তিন দিন ধরে মহা সমারোহে কালীপূজোর উৎসব হয় । এই উৎসবে যাত্রা, কবিগান এবং অন্যান্য নানা অন্যান্য নান অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকে। এই আড়ানীতেই খ্যাপা বাবার আর্বিভাব । এই আশ্রমে বাঘা উপজেলা থেকে অটো রিকসা যোগে আশ্রমে আসা যায় । অথবা ট্রেন ঈশ্বরদী জংশন হইতে রাজশাহী রেল লাইনের আড়ানী স্টেশনের দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে বড়াল নদীর তীরে অবস্থিত।
৬। উৎসব পার্কঃ
চার দিকে সবুজে ঘেরা মেঠো পথ ছুঁয়ে আমবাগান আর পুকুর পাড়ে ঘেঁষে হালকা রোদের আলতো ছায়ায় চলছে ঝিক ঝিক রেলগাড়ি,ক্ষণিকের জন্য হলেও এমন ভ্রমণের কথা মনের ভেলায় ভাসলে শিহরণ জাগবেই। আর এমন আনন্দেই পুলকিত হচ্ছে রাজশাহীর প্রত্যন্ত বাঘা উপজেলার মানুষ।
গ্রামীণ পরিবেশে শহুরে অনুভূতির পরশ বুলিয়ে দিতে উদ্বোধন করা হয়েছে বিনোদনের নতুন ঠিকানা’ উৎসবপার্ক’। প্রত্যন্ত উপজেলার গ্রামীণ মানুষদের বিনোদনের খোরাক জোগাচ্ছে এপার্ক। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মনে আনন্দের জোয়ার বয়েযাচ্ছে পার্কটিকে ঘিরে। ট্রেন ছাড়া ও পার্কটিতে ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে দোলনা ও ঘূর্ণিসহবি ভিন্ন রাইডস।রয়েছে বনের রাজা সিংহ,রয়েল বেঙ্গলটাইগার, হাতি ওভল্লুকের ভাস্কর্য।পার্কটি সকাল৯ টাথেকে সন্ধ্যা৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশ মূল্য রাখা হয়েছে ২০টাকা । রাইডস উপভোগ করার জন্য একই মূল্যের টিকিট রয়েছে। এছাড়া পার্কের মধ্যে উন্নত বিভিন্ন কোম্পানির আইসক্রিম, ফুচকা, চটপটি,ঝাল-মুড়িসহ রয়েছে মুখরোচক নানা খাবারের সমাহার।বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে নিজস্ব জেনারেটর এবং নিরাপত্তার জন্য আনসার ও নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে।
খাবার সমূহঃ ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়। যেমন
-
আমঃ স্বাদে ও গুণে আমের বিকল্প আর কোনো ফল বোধ হয় নেই। তাই বাংলাদেশে আমকে ফলের রাজা উপাধি দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্বাদের দিক থেকে আমকে টেক্কা দিতে পারে গরমকালে এমন ফল খুব কমই রয়েছে। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরমে আম ছাড়া কিছু হয় না। খিদে মেটাতে তাই ফ্রিজ থেকে বের করে আম খাওয়ার প্রবণতা আম বাঙালির মধ্যে দেখা যায়!
-
খেজুর রস ও গুড়ঃ আমাদের বাঘার খেজুর রস ও গুড়ের বেশ নাম আছে। আমাদের এ অঞ্চলের খেজুর রস অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় কম রসে বেশি গুড় উৎপাদন হয় ফলে গুড়ের সাধ ও বেশ ভাল।
-
পিঠা পুলিঃ শীত কালে ভাপা পিঠা, পাটিসাপ্টা পিঠা, পাকোয়ান, বকুল ও রস পিঠা সহ বাহারি রকম পিঠা পাওয়া যায় যা যে কেউ খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারবে।
### ঐতিহ্যঃ আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের মাঝে অন্যতম হলো বাঘার মেলা ও লাঠি খেলা। বাঘার মেলা ৫০০ বছর ধরে প্রতিবছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় এবং পহেলা বৈশাখ কে কেন্দ্র করে লাঠি খেলার আয়োজন হয়ে থাকে।### মজার তথ্যঃ বাঘার বাউসা ইউনিয়নে একই নামে ২২ গ্রাম। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের ২২টি গ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই বাউসার নাম।উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর দিকে বাউসা ইউনিয়ন পরিষদ।এই ইউনিয়ন পরিষদের আশপাশে রয়েছে গ্রামগুলো। এগুলো এই ইউনিয়নের অধীনেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গ্রামগুলোর দূরত্ব প্রায় দেড় থেকে আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে।
গ্রামগুলো হল হাটপাড়া বাউসা*,* কারিকরপাড়া বাউসা*,* সরকারপাড়া বাউসা*,* কসের সরকারপাড়া বাউসা*,* দাঁড়পাড়া বাউসা*,* চকরপাড়া বাউসা*,* টলটলিপাড়া বাউসা*,* মধ্যপাড়া*-তেনাচুরা বাউসা,* পূর্বপাড়া বাউসা*,* মণ্ডলপাড়া বাউসা*,* বেনুপুর বাউসা*,* ভাড়ালিপাড়া বাউসা*,* কামারপাড়া বাউসা*,* মিয়াপাড়া বাউসা*,* ঠাকুরপাড়া বাউসা*,* হেদাতিপাড়া বাউসা*,* পন্ডরিপাড়া বাউসা*,* মাঝপাড়া বাউসা*,* ফতেপুর বাউসা*,* চক বাউসা*,* টাইরিপাড়া বাউসা*,* কাচারিপাড়া বাউসা।
বিঃদ্রঃ এই পোষ্টে ব্যাবহ্নত কিছু ছবি ও তথ্য বিভিন্ন ওয়েব সাইট থেকে সংগ্রহীত করা হয়েছে।
#meetup200 #bdlg200 #bdlg #bangladeshlocalguides #localguidesbd







