হয়ে গেল বাংলাদেশ লোকাল গাইড এর 128 তম মিটআপ। যার টাইটেল ছিল " Let’s Revise our history again" @MehadeHasan ভাই মিটআপ টি হোস্ট করেছিলেন। তার অতিথিয়তা এবং উপস্থাপনা ছিল মনমুগ্ধকর।
মিট আপে মূল কার্যক্রম হিসেবে যা যা ছিল:
• ফটোওয়াক এবং মানচিত্র সম্পাদনা
• স্থানীয় গাইড প্রোগ্রাম এবং গুগল ম্যাপ সম্পর্কে আলোচনা
• ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক অনুসন্ধান
• পানাম সিটি ভ্রমণ ও বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প মেলা পরিদর্শন।
যেহেতু আমি দুই ঘণ্টা দেরি করে এসেছিলাম ছুটির দিন থাকায়, তাই আমি শুধুমাত্র পানাম সিটি সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি তা উপস্থাপন করব ও মেলা সম্পর্কে কিছুটা লিখব।
পানাম সিটি:
দিনটি ছিল শুক্রবার। 31 জনুয়ারি 2020 রওনা দিলাম ১২৮ তম মিটআপের উদ্দেশ্যে কুড়িল চোরাস্তা থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। সব মিলে আমাকে 27 কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। যানজটের নগরী ছেড়ে একটু প্রশান্তির বাতাস নিতে চাই আর সেখানকার অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।
পানাম নগর নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ এ অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর এখানে কয়েক শতাব্দী পুরনো অনেক ভবন রয়েছে যা বাংলার বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাস কে বহন করে। টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। সোনারগাঁ 20 কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই নগরীতে গড়ে ওঠে এই পানাম নগর পৃথিবীর 100 টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি। একসময় ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল পূর্বে মেঘনা ও পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদী পথে বিলে থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড় দেশ থেকে যত মুসলিম। শীতলক্ষ্যার আর মেঘনা ঘাটে প্রতিদিনই ভিরত পালতোলা নৌকা প্রায় ওই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর কারণে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণার উপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়ে ওঠে পানাম নগরী। পরবর্তীতে এই পোশাক বাণিজ্যের স্থান দখল করে নিল বাণিজ্য। ইংরেজরা এখানে বসিয়েছিলেন নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র। সেই সাথে ছিল মসলিন কাপড়ের জমজমাট ব্যবসা। প্রাচীন নগরীর আর কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই এখন আছে শুধু ঘুরে দেখার মতো ঐতিহাসিক সেই পুরনো বাড়ি গুলো। এই মুহূর্তে আমি অবস্থান করছি 500 বছর পুরনো পানাম নগরে ভিতরে ঢোকার পর থেকেই আমার মধ্যে অনেক ধরনের প্রশ্ন অনেক ধরনের কল্পনা মাথায় কাজ করছিল, পনেরশো শতকে এই পানাম নগরে ঈশা খাঁ তা রাজধানী স্থাপন করেছিলেন যে রাজধানী কে বাংলার প্রথম রাজধানী বলা হয়। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড 2006 সালে পানাম নগর কে বিশ্বের প্রায় 100 টি ঐতিহাসিক স্থাপনা তালিকায় প্রকাশ করে, বড়নগর খাশনগর, পানাম নগর প্রাচীন সোনারগাঁও এই তিনটি নগরের মধ্যে পানাম ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। জানা যায় চৌদ্দশ শতাব্দীতে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে পৃথিবীর নামিদামি শিক্ষকরা পড়াতে আসতেন। পানাম নগরীর দুই ধারে উপনিবেশিক আমলে 52 টি স্থাপনা রয়েছে, এর উত্তর দিকে 31 টি এবং দক্ষিণ দিকে একুশটি উপস্থাপনা অবস্থিত। স্থাপনা গুলোর স্থাপত্য ইউরোপীয় শিল্পরীতির সাথে মুঘল শিল্পরীতি মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। পানাম নগরী নিখুঁত নকশার মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে তাই প্রতিটি বাড়িতে খুব সহ আবাস উপযোগী নিদর্শন রয়েছে। 500 বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বাহক এই ধ্বংসপ্রায়। বাঙালির 500 বছর পূর্বে কিন্তু যে ঐতিহ্য বাংলায় যে সংস্কৃতি তার ধারক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইটকাঠের এই নগরী, আজ এই নগরী প্রায় ধ্বংসস্তূপের মত অবস্থানে আছে। কিন্তু তারপরেও প্রতিটি ইট কাট, সেই রাজা-বাদশা নেই, নেই সেই ঐতিহ্য, প্রজা, এখনো কিন্তু বহন করে চলছে বাঙালির সে ঐতিহ্য এর প্রতিটি ইটে কান পাতলে শোনা যায় বাঙালির ইতিহাসের সমৃদ্ধি সেটি কিন্তু আজও কানে শোনা যায়।
নগরীর পানি সরবরাহের জন্য দুই পাশে খাল ও পুকুর অবস্থান লক্ষ্য করা যায় এখানে আবাসিক ভবন ছাড়া উপসনালয়, গোসলখানা, পান্থশালা, দরবার কক্ষ ইত্যাদি রয়েছে। পানাম নগর এর আশেপাশে আরো কিছু স্থাপনা রয়েছে যেমন ছোট সরদার বাড়ি, ঈশা খাঁর তরুণ, নীলকুঠি, বনিক বসতি, ঠাকুরবাড়ি, পানাম নগর সেতু। আবহমান গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতি ধারা বিকশিত করার জন্য 1975 খ্রিস্টাব্দের 12 ই মার্চ এ সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক পানাম নগরীর একটি পুরনো বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। পরে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্সটি প্রায় 100 বছর পুরানো সরদার বাড়িতে স্থানান্তরিত হয় এখানে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার কারুপল্লী ও একটি বিষয় লেক, এখানে স্থান পেয়েছে দেশের অবহেলিত গ্রাম-বাংলার নিরক্ষর শিল্পীদের হস্তশিল্প ও জনজীবনের নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী। এসব শিল্প সামগ্রীতে তৎকালীন প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক লোকশিল্পের রূপচিত্র প্রস্ফুটিত হয়। সরদার বাড়িতে দশটি গ্যালারি রয়েছে গ্যালারিতে কাঠ খোদাই, কারুশিল্প, পট চিত্র, মুখোশ, আদিবাসী জীবন ভিত্তিক নিদর্শন, গ্রামীণ লোকজীবন এর পরিবেশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, ও পোড়ামাটির নিদর্শন তামা, কাঁসা, পিতলের নিদর্শন, লোহার তৈরি নিদর্শন, লোকজ অলংকারসহ রয়েছে বহু কিছু।
জানুয়ারি মাসে এখানে সাড়ম্বরে আয়োজিত হয় লোকশিল্প মেলা এই মেলায় লোকো সঙ্গীত, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, বাইস্কোপ, কবিগান, ইত্যাদি লোকসংস্কৃতি ঐতিহ্যবাহি অনুষ্ঠানমালা পরিবেশন করা হয়। এছাড়া জাদুঘরে সম্মুখে অবস্থিত লেকে নৌকা ভ্রমন ও শীত মৌসুমে টিকিট কেটে মাছ ধরা ব্যবস্থা আছে। দর্শনার্থীদের খাওয়া দাওয়া করার জন্য রয়েছে ক্যান্টিন।
এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে যাবেন সোনারগাঁও। গুলিস্তান থেকে যাবেন মুরগাপাড়া চৌরাস্তা ভাড়া 40 থেকে 50 টাকার মধ্যে সরাসরি বাস পাবেন। সময় লাগবে 1 ঘন্টা। মোরগাপারা চৌরাস্তা থেকে জাদুঘরে যেতে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি 10 টাকা, প্রতি বুধ ও বৃহস্পতিবার জাদুঘর বন্ধ থাকে।
সোনারগাঁও এর ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ৩টি স্থান এগুলো হলো:
১. ৯০০ বছরের পুরনো প্রাচীন টাকশাল। এটি সমগ্র বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন টাকশাল।
২. বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন ইসলামিক বিশ্ব বিদ্যালয়।
৩. সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এর কবর।
ঘুরে আসুন ফটোগ্যালারী থেকে, মিটআপে তোলা সম্পূর্ণ ছবির লিংকটি শেয়ার করা হল, ক্লিক করুন এই লিংকে।
ধন্যবাদ সবাইকে কষ্ট করে পোস্টটি পড়ার জন্য।



