শরৎকালের এক সন্ধ্যা। সময় যেন থেমে আছে, কোনোভাবেই কাটতে চাইছিল না। শুধু অপেক্ষা করছিলাম কখন ঘড়িতে ১০টা ৩০ মিনিট বাজবে, আর আমি স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। আমাদের ট্রেন রাত ১১টা ২০ মিনিটে ছাড়বে। যদিও স্টেশন মাত্র দশ মিনিটের পথ, তবুও কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি। কারণ ট্রেন তো আমার জন্য অপেক্ষা করবে না।
অবশেষে ১০টা ২৮ মিনিটে @Md.Aminul-Islam ভাইয়ের কল পেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জয়দেবপুর রেলওয়ে স্টেশনে। দেখি সফরসঙ্গী @AH_Zakir ভাই ও আমিনুল ভাই আগে থেকেই উপস্থিত। কিছুক্ষণ পর ঢুয়েট থেকে @AlidMahmud ভাই, রাকিব ভাই ও তার বন্ধুরা এসে মিলিত হন। আমাদের টিমে মোট ১১ জন, যার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ জনের বয়স মাত্র ১২ বছর।
আগেই অনলাইনে টিকিট কেটে রাখায় ঝামেলা হয়নি। যথাসময়ে প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এলো, আমরা উঠে বসলাম মোহনগঞ্জগামী হাওর এক্সপ্রেসে। গন্তব্য নেত্রকোণার কলমাকান্দার পাচগাঁও।
ট্রেনে উঠেই দেখি ভিড়! বৃহস্পতিবার হওয়ায় সবাই সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে গ্রামে ফিরছিল। তবে গফরগাঁও স্টেশনে পৌঁছানোর পর দৃশ্যটা বদলালো, অনেক যাত্রী নেমে যাওয়ায় ট্রেন কিছুটা ফাঁকা হয়ে গেল।
রাত প্রায় দেড়টার দিকে আমরা পৌঁছালাম ময়মনসিংহ স্টেশনে। যেহেতু ট্রেন এখানে দীর্ঘক্ষণ বিরতি দেয়, তাই আমরা সবাই নেমে “ময়মনসিংহ জংশন” নামফলকের সামনে ছবি তুলতে গেলাম। ছবি তুলে যখন আবার ট্রেনে ফিরছি, তখনই বিপত্তি। অলিদ ভাই খেয়াল করলেন তিনি তার ব্যাগ নামফলকের পাশে ফেলে এসেছেন। ব্যাগ আনতে তিনি তাড়াহুড়া করে নেমে গেলেন, কিন্তু তখন ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে! ফলে আমরা বাধ্য হয়ে অলিদ ভাইকে ময়মনসিংহ স্টেশনে রেখেই যাত্রা চালিয়ে যেতে হলো।
আমাদের একটা গ্রুপ ছবিঃ-
মন খারাপ হয়ে গেল সবার। কিন্তু আলমগীর ভাই আমাদের সাহস দিলেন -“যাত্রা পথে যা-ই হোক না কেন, ট্রিপটা যেন আমরা উপভোগ করি।”
এভাবেই গৌরীপুর, শ্যামগঞ্জ, নেত্রকোণা পাড় হয়ে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আমরা নামলাম ঠাকুরাকোণা স্টেশনে। গভীর অন্ধকার, তাই রওনা না দিয়ে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করতে লাগলাম। হেঁটে হেঁটে, গল্প করে রাত কাটালাম।
ভোর হলে দেখি আকাশ মেঘলা, সঙ্গে টিপটিপ বৃষ্টি। কাছের এক হোটেল থেকে নাশতা করে দুটো ইজিবাইক রিজার্ভ করলাম কলমাকান্দার উদ্দেশ্যে। ঠাকুরাকোণা থেকে দূরত্ব ২২ কিলোমিটার।
পথটা ছিল অসাধারণ, পিচঢালা রাস্তার দুপাশে বিশাল বিল, তাতে ফুটে আছে অসংখ্য শাপলা। যেন চারপাশ লাল-সাদা ফুলের সমুদ্রে ভরে গেছে। শাপলা ভোরে ফোটে, আর আমরা যাচ্ছিলাম খুব ভোরে, তাই সৌন্দর্যটা ছিল চোখ ধাঁধানো। রাস্তা প্রায় ফাঁকা, মাঝে মধ্যে কেবল কৃষকদের দেখা মিলত। অবাক করা বিষয় হলো—সকালে ৬টার দিকেই বাজারের দোকানপাট খোলা!
৪০-৪৫ মিনিট পর আমরা পৌঁছালাম কলমাকান্দা বাজারে। তখনও ঝুম বৃষ্টি। ইজিবাইকের চুক্তি সেখানেই শেষ হওয়ায় সবাই কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম—এত কাছে এসেও ট্যুর কি বাতিল হয়ে যাবে? তবে কিছুক্ষণ দরদাম করার পর নতুন ইজিবাইক ঠিক হলো পাচগাঁও যাওয়ার জন্য।
রাস্তা ভাঙাচোরা হওয়ায় মনে হচ্ছিল ১২ কিলোমিটারের পথ যেন শেষই হবে না। অবশেষে সকাল ৮টার দিকে পৌঁছালাম পাচগাঁও। তবে আকাশ মেঘলা থাকায় পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। আমরা ভিউপয়েন্টে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হলো, মেঘের আড়াল থেকে ভেসে উঠল দূরের মেঘালয়ের পাহাড়। শীর্ষে তখনও মেঘ জমে ছিল। সেই দৃশ্য সত্যিই মোহিত করল সবাইকে।
কিছুক্ষণ ফটোসেশন শেষে গেলাম এমপির বাগানবাড়ি দেখতে। জায়গাটা খুবই সুন্দর, তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আমাদের গভীরে যেতে দেয়নি। ফেরার পথে হঠাৎ আমাদের ইজিবাইক উল্টে যায়। আমি ও আলমগীর ভাই ঠিক থাকলেও আমিনুল ভাই মারাত্মকভাবে আঘাত পান। কাছের এক আদিবাসী বাড়িতে নিয়ে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরে ডাক্তারও দেখানো হলো।
এরপর আমরা সীমান্ত সড়ক ধরে গেলাম মহাদেব নদীতে। ঠান্ডা পানিতে নেমে স্নান, ফটোশুট, অসাধারণ অনুভূতি।
স্নান শেষে লেঙ্গুরা বাজারে গিয়ে টাটকা মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার রওনা দিলাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। সীমান্ত সড়কের পাশ দিয়ে চলতে চলতে বিশাল পাহাড়গুলো চোখে পড়ছিল। অবশেষে আমরা পৌঁছালাম সোমেশ্বরী নদীর তীরে, যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল বাংলাদেশ লোকাল গাইডসের ২৬৮তম মিটআপ। আমরা তাতে অংশ নিই।
আমাদের তোলা কিছু গ্রুপ ছবিঃ
মিটআপ শেষে সবাই মিলে চা খেয়ে ময়মনসিংহগামী বাসে উঠলাম। সেখান থেকে আবার ঢাকাগামী বাসে উঠে সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে গেলাম গাজীপুরে।
এভাবেই আনন্দ, দুঃখ আর অসংখ্য স্মৃতিতে ভরপুর আমাদের পাচগাঁও ভ্রমণ শেষ হলো।
#bangladeshlocalguides, #bdlg, #localguidesbd




















