কোণার্ক সূর্য মন্দির (Konark Sun Temple)

পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ এবং জীবনধারণ সূর্যের দ্বারা।

এটা প্রাচীনকালের মানুষেরাও বুঝেছিলেন। তাইতো মানব সমাজে সভ্যতার শুরু থেকেই “সূর্য” গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাচীন প্রায় সব সভ্যতায় সূর্যদেব পূজিত হয়েছেন। মিশর, মেসোপটেমিয়া, গ্রীক বা ভারতীয় সভ্যতা প্রত্যেকটি আদি সভ্যতায় সূর্যের আরাধনা লক্ষ্য করা যায়।

আজ কথা বলব স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য "কোণার্ক সূর্য মন্দির" নিয়ে।

কোণার্ক সূর্য মন্দির ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরী জেলার কোণার্ক শহরে অবস্থিত। মন্দিরটি ১২৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের রাজা প্রথম নরসিংহদেব এটি নির্মাণ করেছিলেন।

মন্দির কমপ্লেক্সের সামনে আমি

মন্দির কমপ্লেক্সটি একটি বিশাল রথের আকৃতিতে (সূক্ষ্ম কারুকার্যময় পাথরের চাকা, স্তম্ভ ও দেওয়াল সহ) তৈরি করা হয়েছে। কাঠামোর একটি প্রধান অংশ এখন ধ্বংসাবশেষ।

কোণার্ক নামটি সংস্কৃত “কোণ” (কোনা বা কোণ) এবং “অর্ক” (সূর্যের আরেক নাম) শব্দদুটির সমন্বয়ে গঠিত, যা মন্দিরের উল্লেখিত সৌর দেবতা সূর্যকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। অর্থাৎ সূর্যের বিভিন্ন কোণের অবস্থান। এই মন্দিরটি এমনভাবে নির্মিত যে সময়ের নিখুঁত হিসেব বের করা যায় এর চাকা দেখে এমনকি মিনিট পর্যন্ত!

এটি নির্মাণ করা হয় কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে।

উপমহাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজনীয় সূর্য দেবতার রয়েছে একটি সপ্ত অশ্ব সম্বলিত দর্শনীয় রথ, যাতে চড়ে তিনি ভোরে উদয় হন এবং সায়াহ্নে অস্ত যান। তাই দেবতার সম্মানে কোণার্কের সম্পূর্ণ সূর্য মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে একটি অতিকায় রথের মতো করে। সপ্ত অশ্ব তথা সাতটি তেজী ঘোড়া টগবগিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ১২ জোড়া চাকার উপর অবস্থিত একটি অতিকায় রথকে, যেটি আসলে মূল মন্দির। আর এর পুরোটাই পাথরে খোদাই করা ভারী কারুকাজে পরিপূর্ণ।

উড়িষ্যা ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে নির্মিত মন্দিরটি ধূসর বেলেপাথরে কোনো রড সিমেন্ট ছাড়াই বিশাল একটি রথের আকারে গড়া হয়েছে। সমুদ্র থেকে উঠে আসা সূর্যদেবের বিশাল রথ, তার সামনে রয়েছে সাতটি ঘোড়া। সাতটি ঘোড়া মানে সপ্তাহের সাত দিন। ১২ জোড়া বিশাল চাকার ওপর পুরো মন্দিরটি নির্মিত। চব্বিশটি চাকা মানে ২৪ ঘণ্টা। প্রতিটি চাকা একেকটি সূর্যঘড়ি। চাকার ভেতরের দাঁড়গুলো সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা। আটটি দাড়ি মানে অষ্টপ্রহর। এখনো নিখুঁতভাবে সময় (প্রহর, ঘণ্টা, মিনিট) জানা যায় এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে।

পূর্বদিকে মুখ করে রাখা হয়েছে এর প্রবেশদ্বার এবং দেবতার আসন (বেদী)। ফলে প্রতিদিন ভোরবেলায় সূর্যের প্রথম আভা সরাসরি দেবতাকে ছুঁয়ে যায়।

কোনার্ক সূর্য মন্দিরের অতিকায় রথের একাংশ

মন্দিরের মূল প্রবেশপথেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দুজন অতিকায় প্রহরী

না, জীবন্ত কোনো প্রহরী নয়। যুদ্ধের হাতিকে পিষে ফেলতে থাকা দুটি বড় বড় সিংহ মূর্তি, যারা প্রতীকী অর্থে পাপ আর অসত্যকে বিনাশ করার প্রতীক।

সিংহদ্বয়কে পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চোখে পড়বে নাট মন্দির। এরপর ভেতরে প্রবেশ করলে পুরো মন্দিরের প্রাচীর দেয়ালগুলোতে চোখে পড়বে জ্যামিতিক প্যাটার্নে অঙ্কিত ফুল ও অন্যান্য নকশা। তবে দেয়ালের যে কারুকার্য অধিক নজর কাড়বে, তা হলো টেরাকোটা খচিত পশুপাখি, নরনারী ও দেবতাদের ছোট ছোট চিত্রকর্ম।

অভিজাত মননে নির্মিত এ মন্দিরের ত্রুটিহীন পরিমাপ, নকশা আর চোখ ধাঁধানো সব পাথুরে খোদাই কাজ যুগে যুগে তৎকালীন স্থাপত্যকলানির্মাণশৈলীর জয়গান গেয়ে চলেছে। পুরো মন্দিরজুড়ে হাজারো ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে যেন পুরো মধ্যযুগীয় ভারতের চিত্রই। নরনারীর প্রেম, ঝগড়া বিবাদ, বিরহ, বিচ্ছেদ কলহ, কিংবা রাজদরবারের চিত্র, রাজকবির গান, নর্তকীদের রাজসভায় নাচ, আর যুদ্ধ ময়দানের হাতি, ঘোড়া, তীর, বর্শা, বর্ম পরিহিত সৈন্য, স্বর্গে মদ্যপানরত দেব-দেবী আর আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ সূর্য, সবই আছে সেসব ভাস্কর্য আর খোদাই করা চিত্রকর্মে। প্রণয় থেকে শুরু করে যুদ্ধ, পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে ইতিহাস সবই তুলে ধরা হয়েছে। পাথর কে ক্যানভাস বানিয়ে নিখুঁত টেরাকোটা যেন চিত্রকর্মকেও হার মানায়!

এ ব্যাপারে একবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন,

এখানে পাথরের ভাষা মানুষের ভাষাকে হার মানিয়েছে!”

বাস্তবতা আর আধ্যাত্মিকতা এর প্রতিটি দেয়ালে মিলেমিশে দুইয়ের মধ্যে এক কাব্যিক মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে। কিন্তু বারবার আক্রমণের কারণে এবং কালে কালে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় এর প্রকৃত সৌন্দর্য থেকে যে আমরা বঞ্চিত হয়েছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মাটি থেকে দু’শতাধিক ফুট উপরে অবস্থিত মন্দিরটির দেবতার পবিত্র বেদীটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রবেশপথের নাট মন্দিরেরও যে অংশটুকু দেখা যায় তা এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সুলায়মান খান কররানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের আক্রমণে কোনার্ক মন্দির প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

সূর্যঘড়ি রথের চাকার সামনে আমি

তথাপি যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তাতেই এ মন্দিরটি অন্যগুলোর চেয়ে অনন্য।

সূর্যের আলোয় সময় নিরূপণ

মন্দিরের দেয়াল ও বেদীর ভাস্কর্য এবং খোদাই করা পাথুরে কাজগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা সম্ভব। একটি উপরের অংশ, অন্যটি নীচের। স্পষ্টত উপরের কাজগুলো নীচের গুলোর চেয়ে অধিক নিপুণ এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত। উপরের অংশে মূলত বিভিন্ন পৌরাণিক পশুপাখি ও দেব-দেবীর ছবি রয়েছে। মা দুর্গার মহিষাসুরকে হত্যার ছবি, নিবিষ্টচিত্ত বিষ্ণু আর শিবলিঙ্গই এদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তবে কৃষ্ণ, সরস্বতী আর গণেশের ভাস্কর্যও ছিল, যেগুলো ব্রিটিশ শাসনামলে লুণ্ঠিত হয়েছে। এরকম কিছু অত্যন্ত চমৎকার ভাস্কর্য বর্তমানে শোভা পাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে।

কোণার্ক সূর্য মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল চন্দ্রভাগা নদীর তীরে। কিন্তু কালের বিবর্তনে নদীটির গতিপথ বেঁকে যায়। ফলে মন্দির থেকে নদীটির দূরত্ব বর্তমানে কয়েক কিলোমিটারের মতো।

উড়িষ্যার পুরী থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত UNESCO WORLD HERITAGE SITE KONARK SUN TEMPLE দেখতে এখন প্রতিদিনই প্রচুর পর্যটক আসেন।

28 Likes

কোণার্ক সূর্য মন্দির নিয়ে তথ্যবহুল লেখা ও সুন্দর কিছু ছবি আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ @AbirAryan

2 Likes

@Saiyen Thank you bro :heart: :heart_eyes:

1 Like

তথ্যবহুল পোস্ট, ধন্যবাদ দাদা আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য @AbirAryan

2 Likes

@Papel_Mahammud স্বাগতম ব্রো :heart:

1 Like

@AbirAryan Thanks for the post.

2 Likes

Hi @AbirAryan

Thanks for sharing the informative article and some beautiful pictures about ‘Konark Sun Temple’ with us.

Happy Guiding~

2 Likes

Hello @AbirAryan

Your post is full of informations. You have described many things. Very good post. Thanks for sharing this with us.

6 Likes

@SanjayBDLG ধন্যবাদ দাদা :smiling_face_with_three_hearts: :pray:t2:

2 Likes

@Designer_Biswajit Thank you Dada, you are my inspiration :heart: :smiling_face_with_three_hearts: :pray:t2:

1 Like

@Tandrima2 Thank you Ma’am, means a lot :pray:t2: :smiling_face_with_three_hearts: :heart:

1 Like