BOKAINAGAR : Fool's king capital. বোকা রাজার রাজধানী ময়মনসিংহের বোকাইনগর!

বোকাইনগর নামের সাথে বোকা শব্দটি থাকায় স্বভাবতই মনে হতে পারে এটি বোকা মানুষের নগর। তবে বোকাইনগরের বাসিন্দারা বোকা ছিলেন না কখনও। তারা ছিলেন সহজ-সরল। ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিমি পূর্বে গৌরিপুর উপজেলায় বোকাইনগরের অবস্থান। জনশ্রুতি আছে, সেখানে কোচবংশীয় বোকা রাজার রাজধানী ছিল।

শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী রচিত ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহের বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মোগল রাজত্বকালে কোচবংশীয় রাজত্বের অবসান ঘটে। কারণ, তারা তেমন শক্তিশালী ছিলেন না। তবে মহৎ ছিলেন। সাধারণের জলকষ্ট নিবারণে খনন করেছিলেন পুকুর ও কূপ, যা কোচবংশীয় রাজাদের কীর্তি হিসেবে আজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পূর্ববাংলার আনাচেকানাচে। বোকা রাজা তার রাজধানী বোকাইনগরে উন্নয়নের যে সূচনা করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা ছিল দীর্ঘদিন। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর বোকাইনগরে নির্মাণ করেন বোকাইনগর কেল্লা।

ঐতিহাসিকরা বলছেন, ওই সময় কেল্লা বোকাইনগর এবং কেল্লা তাজপুর ছিল এ অঞ্চলের প্রধানতম স্থান। ধনে-জনে-মানে, ঐশ্বর্যে, সভ্যতায় এ দুটি স্থানই ছিল এলাকার শ্রেষ্ঠতম।

বোকাইনগরের সমৃদ্ধি রক্ষায় আরও একজনের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি হলেন বিখ্যাত জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র চৌধুরী। ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে অনুর্বর ও বিরোধপূর্ণ এ এলাকার জমিদারি লাভ করেন তিনি।

কথিত আছে, তৎকালীন নবাব মুর্শিদকুলী খান বিরোধপূর্ণ ওই জমিদারির দায়িত্ব দেন কৃষ্ণচন্দ্র চৌধুরীকে। নবাব স্বয়ং ওই জমিদারি দখলে সহায়তা করতে আদেশ দিয়ে চিঠি লিখে দেন কেল্লা বোকাইনগরের দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে। জমিদার শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র চৌধুরী একশ’ নৌকায় লোক-লস্কর, জিনিসপত্র নিয়ে আসেন সেখানে। সেখানেই নির্মাণ করেন তার বসতবাড়ি।

আরও জানা যায়, ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে নগরটি হোসেন শাহ এর নিয়ন্ত্রণে আসে এবং তিনি তাঁর পুত্র নুসরত শাহকে এর অধিকর্তা নিয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে উসমান খান আফগান মুগলদের কাছে পরাজিত হয়ে উড়িষ্যা থেকে পালিয়ে ঈশা খান এর আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বোকাইনগরের সামন্তরাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি নগরের বিভিন্ন দুর্গ পুনঃনির্মাণ করে এটিকে একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এখান থেকে মোঘলদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খান তাঁকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করেন এবং দুর্গটি মোঘলদের অধিকারে চলে আসে।

তবে বোকাইনগর গ্রামের নামকরন নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ প্রচলিত আছে।

প্রফেসর কাজী এম, এ মোনায়েম রচিত গৌরীপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কিংবদন্তী থেকে জানাযায়- কারো মতে, সৈয়দ বাখাইয়ের নামে এই এলাকার নাম ছিল বাখাইনগর। আবার কারো মতে, সামত্ম রাজা বোকানের নামে এই এলাকার নাম ছিল বোকানান নগর। আবার কারো মতে, গারো হাজংদের সর্দার বোবাইয়ের নামে বোবাইনগর। আবার কারো মতে, গারো রাজ বোকাইকোচের নামে বোকাইনগর নাম করন করা হয়েছে।

সৈয়দ বাখাইয়ের নামে বাখাই নগর
তাপস বর নিজাম উদ্দিন আউলিয়া নামে জনৈক ব্যক্তি বোকাইনগর এলাকায় এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য। তিনি এই এলাকায় মাত্র চলিস্নশ দিন অবস্থান করেছিলেন। এই নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার সঙ্গী হিসাবে এসেছিলেন সৈয়দ বাখাই নামে জনৈক বুজর্গ ব্যক্তি।

কথিত আছে, সৈয়ত বাখাই ছিলেন রাশিয়ার উজবেকিস্থানের বা তাসখন্দের অধিবাসী। নিজাম উদ্দিন আউলিয়া সৈয়দ বাখাইয়ের উপর এ এলাকার নেতৃত্ব অর্পন করে দিলস্নী চলে যান। পরবর্তী সময়ে ইসলাম র্ধম প্রচারক সৈয়দ বাখাই এখানে মৃত্যু হলে এই বুজর্গ ব্যক্তি সৈয়দ বাখাইয়ের নামে এই এলাকার নামকরন করা হয়েছিল বাখাইনগর।

সামত্মরাজ বোকাননের নামে বোকানন নগর
কোন এক ঐতিহাসিকের মতে, খ্রীষ্টিয় দশম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে বর্তমান ময়মনসিংহ জেলা সদর থেকে পনের মাইল দুরে পূর্বদিকে বালুয়া নদীর তীরে বোকানন নামে এক গারো সামমত্মরাজা একটি ছোট রাজ্যের পত্তন করেছিলেন। সেই বোকানন গারোর রাজধানী ছিল বোকানন নগরে। পরে তার নাম অনুসারে এই রাজ্যের নাম করন করা হয়েছিল বোকানন নগর।

গারো হাজং সর্দার বোবাইয়ের নামে
বোবাইনগর বোকাইনগর এলাকায় বাস করতো বোবাই নামে এক গারো। সেছিল এই অঞ্চলের গারো হাজংদের সর্দার। তার অঞ্চলে দস্যু নিজাম উদ্দিনের আর্বিভাব হলে এ অঞ্চলের আইন শৃংখলার অবনতি ঘটে। এনিয়ে গারো সর্দার বোবাইয়ের সাথে দস্যু নিজাম উদ্দিনের বিরোধ বাধে। দস্যু নিজাম উদ্দিনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গারো সর্দার বোবাই অন্যত্র চলে যাবার সিদ্ধান নেয়।

একদিন বোবাই দস্যু নিজাম ঊদ্দিনের আসত্মানায় গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করে এ অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবার কথা জানায়। যাবার সময় গারো সর্দার বোবাই তার নামে এ অঞ্চলের নাম করনের জন্য দস্যু নিজাম ঊদ্দিনের কাছে অনুরোধ জানায়। পরবর্তী সময়ে দস্যু নিজাম আউলিয়া নিজাম ঊদ্দিন হয়ে আত্ম প্রকাশ করে। আউলিয়া নিজাম ঊদ্দিনের নির্দেশেইউক্ত বোবাই গারোর নামে এই এলাকার নাম করন করা হয় বোবাইনগর।

বোকাই কোচের নামে বোকাইনগর
১০৫০ খ্রীঃ পূর্বে শাহ্ সুলতান কমর ঊদ্দিন রুমী (রহঃ) বোকাইনগর এলাকায় এসে আসত্মানা গাড়েন। সে সময় বোকাইনগর কামরম্নপ রাজ্যের অমর্ত্মগত ছিল এবং বোকাইকোচ নামে এক সামমত্ম রাজা এই অঞ্চলের শাসন কর্তা ছিলেন। শাহ্ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রহঃ) এর ইসলাম ধর্ম প্রচারে উদ্ধুদ্ধ হয়ে বোকাইকোচ মুসলমান হলে তিনি বোকাইকোচের নামানুসারে এই এলাকার নাম করন করেন বোকাইনগর।

প্রথমে বাখাই নগর (বাখাই হচ্ছে ফার্সী শব্দ) বাখাই নগর থেকে বোকানন নগর, বোকানন নগর থেকে বোবাইনগর এবং সবশেষে বোকাইনগরে রূপান্তরিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে শ্রেষ্ঠ আফগান বীর খাজা ওসমান বোকাইনগর গ্রামে এসে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করে কেলস্না নির্মান করেন। বোকাইনগরের সাথে কেলস্না শব্দ ব্যবহৃত হয়ে এই এলাকার নাম করন করা হয়েছে কেলস্না বোকাইনগর।

কেল্লা বোকাইনগর
সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে তৎকালীন বাংলার সুবেদার খাজা উসমান গণি এই কেল্লাটি নির্মাণ করেন। তিনি এই কেল্লার সাথে একটি মসজিদ নির্মাণ ও একটি পুকুর খনন করেন। পরবর্তী সুবেদার চাঁদ রায় এই কেল্লার সাথে আরও একটি পুকুর খনন করেন এবং একটি মন্দির নির্মাণ করেন। মসজিদ, মন্দির ও কেল্লার ধ্বংসাবশেষ এখনও বর্তমান আছে। পুকুর দুটো ভরাট হয়ে গেছে এতে এখন ফসলের চাষাবাদ করা হয়। চাঁদ রায় বোকাইনগর রেল ষ্টেশনের কাছে একটি সেতুও নির্মাণ করেন। সেতুটি কালক্রমে মাটির নীচে চলে গেছে।

শাহী মসজিদ
কেল্লা বোকাইনগরে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের পশ্চিম চামারখালি নদীর মোহনায় ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদ রয়েছে। এর নাম শাহী মসজিদ। প্রায় ৩ শত ১৮ বছর (বাংলা ১১০৫ সনে) আগে মোগল আমলে নির্মিত হয় প্রাচীন এই মসজিদটি। অনেকের মতে এর নির্মাণ করেন মজলিস খাঁ হুমায়ূন। আবার অনেকের মতে খাজা ওসমান খাঁ। মোঘল স্থাপত্য রীতি অনুসারে মসজিদটি নির্মিত হয়। চুন সুরকি ও বর্গাকৃতি কয়েক রঙের মূল্যবান পাতলা ইট দিয়ে তৈরি করা হয় মসজিদটি। প্রায় আড়াই হাত পুরো একটি মাত্র গম্ভুজের উপর নির্মিত হয় মসজিদ টি। বর্তমানে মসজিদের গম্ভুজটি নেই। ভাঙাগড়ার কারনে এর সৌন্দর্যহানি হয়েছে অনেক। তবে সামনের অংশ সেই মোঘল যুগের দেয়াল অবশিষ্ট আছে।

যেভাবে যাবেন
সড়ক পথে- ঢাকা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পথে ময়মনসিংহ সদর (প্রায় ১২০কি.মি.) হয়ে ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক পথে কলতা পাড়া হয়ে (প্রায় ২০ কি.মি.) দূরে গৌরীপুর উপজেলা পরিষদ। গৌরিপুরের ভিতরই এ রেলস্টেশন সংলগ্ন এ নগর।
রেলপথে- ঢাকা থেকে ঢাকা-ভৈরব কিশোরগঞ্জ হয়ে (প্রায় ২২০ কি.মি.) দূরে এবং ঢাকা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ হয়ে (প্রায় ১৫০ কি.মি.) দূরে গৌরীপুর উপজেলা পরিষদ।

সংকলন: মেহেদী হাসান আবদুল্লাহ,
তথ্য: উইকিপিডিয়া, গৌরিপুর উপজেলা তথ্য বাতায়ন ও অনলাইন মাধ্যম।

বি:দ্র: এর থেকে বেশি বা এই বোকাইনগর সম্পর্কে বিস্তারিত আরও কোন তথ্য জানা থাকলে উল্লেখ করার অনুরোধ।

28 Likes

বোকাইনগর সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস জানলাম। ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য। আরো কিছু ছবি থাকলে ভালো হতো।

2 Likes

ধন্যবাদ; ইনশাআল্লাহ

1 Like

সুন্দর ঐতিহাসিক গল্প।

নাম দেখে প্রথমে অন্নরকম কিছু মনে হওয়াটা স্বাভাবিক :blush:

2 Likes

ধন্যবাদ ভাই

ইতিহাস জানতে আমার সব সময়ই খুব ভালো লাগে।

গৌরিপুর একবার গিয়েছিলাম। আরেকবার গেলে অবশ্যই ঘুরে দেখার চেস্টা করব @MehediAbdullah

1 Like

Hi @MehediAbdullah

Very much interesting topic and historical too,

Enjoyed to read it

Thanks for sharing with us

Have a great day :christmas_tree:

Hyder

2 Likes

BOKAINAGAR is indeed a unique place having so many stories behind its name.

What is that tin shed structure in your photos? @MehediAbdullah

2 Likes

Initially, '‘tin shed structure’ is a railway station named Bokainagar, built hundreds of years ago in that area.

Thank you for your comment.

ধন্যবাদ ভাই… অবশ্যই দেখে আসবেন।

বোকাইনগর সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানতে পারলাম, অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই :smiling_face_with_three_hearts::smiling_face_with_three_hearts::smiling_face_with_three_hearts::smiling_face_with_three_hearts::smiling_face_with_three_hearts:

1 Like