ভোর ৪টায় ঢাকা যখন গভীর ঘুমে, আগারগাঁও তখন জেগে ওঠে হাজারো ফুলের হাসিতে।
ঢাকা শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে যদি একটু প্রশান্তি খুঁজতে চান, যদি মন খারাপের সকালে এক মুঠো রঙ খুঁজতে চান, তবে আপনাকে যেতেই হবে আগারগাঁও ফুলের বাজারে। শাহবাগের খ্যাতির আড়ালে থাকা এই বাজারটি আসলে ঢাকার ফুল ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি।
১. বাজারের শুরুটা কোথায়?
অনেকেই জানেন না, এই বাজারটির জন্ম আগারগাঁওয়ে নয়। এর শুরু হয়েছিল খামারবাড়িতে। প্রায় ২০ বছর ধরে ফুলের ব্যবসা করছেন এমন ব্যবসায়ী মোঃ ওয়াজেদ আলীর ভাষ্যমতে, তিনি প্রথমে সাদুল্লাপুর, বিরুলিয়াতে ব্যবসা করতেন, তারপর আসেন খামারবাড়ি। প্রায় ১০-১২ বছর আগে খামারবাড়ি থেকে সরকারি নির্দেশনায় বাজারটি স্থানান্তরিত হয়ে আসে বর্তমান আগারগাঁওয়ে, সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ এভিনিউতে।এখন এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০/১০০ টি দোকান রয়েছে। অস্থায়ী শেডের নিচে, বাঁশের মাচায় থরে থরে সাজানো ফুল। দেখলে মনে হবে যেন কোনো শিল্পী তার রঙের প্যালেট উপুড় করে দিয়েছে।
২. ভোরের বাজার: এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
আগারগাঁও ফুল মার্কেটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সময়। এটি কোনো সাধারণ বাজার নয়।
বাজার বসে রাত ৩টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত।
যশোরের গদখালী, দেশের ফুলের রাজধানী থেকে পিকআপ ভর্তি করে সারাত জার্নি করে ফুল আসে এখানে। ভোরের আলো ফোটার আগেই পাইকারদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সকাল ৬টা থেকে ৮টা হলো এই বাজার দেখার সবচেয়ে সুন্দর সময়। হাজারো তাজা ফুলের গন্ধ, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
৩. কী কী ফুল পাওয়া যায় এবং দাম কেমন?
এখানে আপনি যা খুঁজবেন তাই পাবেন। দেশি বিদেশি সব ফুলের সমাহার।
প্রধান ফুলগুলো:
গোলাপ, লাল, সাদা, হলুদ, গোলাপি সব রঙের। সাধারণ দিনে ৫০টি গোলাপের আঁটি মাত্র ৫০-১০০ টাকায় পাওয়া যায়, যা শাহবাগ বা অন্য কোথাও ৩০০-৪০০ টাকা।
গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস,বিয়ে ও পূজার জন্য সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন।
জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, ক্যালেন্ডুলা, বোতাম ফুল বাসা সাজানো বা বুকের জন্য পারফেক্ট।
-বেলি, জুঁই, হাসনাহেনা, মালার জন্য।
এখানে দাম নির্ভর করে আবহাওয়ার উপর। কৃষকদের মতে, যখন রোদ বেশি থাকে তখন উৎপাদন বাড়ে, দাম কমে। আর কুয়াশা বা বৃষ্টি হলে উৎপাদন কমে যায়, দাম বেড়ে যায়।
৪. মানুষগুলোর গল্প
এই বাজার শুধু ফুলের নয়, মানুষেরও।
এখানে দেখা পাবেন ৬০ বছর বয়সী তাসলিমা খালার। তিনি আগে দোকান করতেন শাহবাগে, এখন আগারগাঁওয়ে। তার দোকানে ইস্টার লিলি আর চন্দ্রমল্লিকা এত সুন্দর করে সাজানো যে, দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। এটা তার পারিবারিক ব্যবসা, ছেলে সাদা গোলাপ বিক্রি করে অন্য পাশে।
আবার আছেন জারবেরা বিক্রেতা সোহান। তিনি বলেন, সাধারণ দিনে বিক্রি কম থাকলেও, বিশেষ দিনের আশায় আমরা বসে থাকি।"
এই মানুষগুলো ফুলকে ভালোবেসেই টিকে আছে।
৫. কেন যাবেন এবং কিছু টিপস
কম দামে বেশি ফুল: শাহবাগের চেয়ে ৫০-৭০% কম দামে ফুল পাবেন।
তাজা ফুল: সরাসরি ক্ষেত থেকে আসে, তাই সবচেয়ে তাজা।
ছবি তোলার স্বর্গ: ফটোগ্রাফারদের জন্য এটা একটা অসাধারণ জায়গা।
মানসিক প্রশান্তি: বিশ্বাস করুন, ১০ মিনিট এই বাজারে হাঁটলে আপনার মন এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে।
যাওয়ার আগে মনে রাখবেন:
১. সকাল ৭টার মধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
২. দরদাম করতে ভুলবেন না, এটি পাইকারি বাজার।
৩. সাথে ক্যাশ টাকা রাখুন, বিকাশ খুব কম দোকানেই আছে।
৪. গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা কম, তাই রিকশা বা বাইকে যাওয়া ভালো।
লোকেশন: আগারগাঁও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭। নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে সরকারি সংগীত কলেজের দিকে যেতে রাস্তার পাশেই বাজারটি বসে।
ঢাকার এই ফুলের বাজারটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই কংক্রিটের শহরেও এখনো সৌন্দর্য বেঁচে আছে, ভোরের আলোয় ফুটে থাকা একেকটি গোলাপের মতো।
একবার সময় করে ঘুরে আসুন। আপনার সকালটা বদলে যাবে।
Md Aminul Islam
#bdlg Community guidelines > The Local Guides Connect community















