টাঙ্গুয়ার নৌ-ভ্রমণ
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ফুটে উঠে বর্ষার সময়। জীবনে প্রথম বারের মত টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া প্রতিটি মুহুর্ত আজীবন স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।
আজকে আমি আমার পোস্টে দেখাবো টাঙ্গুয়ার হাওরের ড্রোন দিয়ে দেখা সৌন্দর্য এবং পাশাপাশি ধারনা দিবো কিভাবে যাবেন এবং কেমন খরচ হতে পারে।
মাধ্যম ও খরচ
- বাস দিয়ে ঢাকা → সুনামগঞ্জ
ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের নন-এসি বাসের ভাড়া হলো প্রতি যাত্রী প্রায় ৪৫০-৮০০ টাকা।
বাস থেকে সুনামগঞ্জ এসে তাহিরপুর বা ঘাট পর্যন্ত CNG/অটো ইত্যাদি নিতে হবে, খরচ খুব বেশি নয় (৫০-১০০ টাকা জনপ্রতি)।
সময়সাপেক্ষ: ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ যেতে সাধারণত ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
- রেল/ট্রেনে যেতে পারেন মোহনগঞ্জ হয়ে
ট্রেন এ ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ হয়ে যাওয়ার পথ রয়েছে। ভাড়া জনপ্রতি ৫০০-১০০০ টাকা যাওয়া আসা।
- প্রাইভেট মাইক্রো গাড়ি / ভাড়া করা গাড়ি
যদি আপনি গ্রুপে যান বা সময় সাশ্রয় করতে চান, প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করা যায়। খরচ একটু বেশি হবে, তবে সুবিধাজনক হবে আপনার জন্য। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে যাওয়া আসা বাবদ ২০০০-৩০০০ টাকা
- **হাউসবোট / নৌ-ভ্রমণ খরচ **
হাওরে নৌকা/হাউসবোট ভাড়া পড়বে — ছোট নৌকা থেকে বড় হাউসবোটে ভাংচুর ভ্যারায়। উদাহরণস্বরূপ: “ছোট নৌকা ১,৫০০-২,০০০ টাকা, মাঝারি ২,৫০০-৩,৫০০ টাকা, বড় হাউসবোট ৩,৫০০-৫,০০০+ টাকা।
রাত তখনো পুরো ফুরোয়নি। ঢাকার নিস্তব্ধ ভোরে আমরা আটজন বেরিয়ে পড়লাম — আগে থেকে ঠিক করা মাইক্রোবাসে করে ব্যাগে জামাকাপড়, ক্যামেরা, শুকনো খাবার আর অজানা উত্তেজনা। গন্তব্য সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। কেউ আগে যায়নি, তবে সবাই ছবিতে দেখেছে — নীল জল, ভাসমান ঘর, আকাশ আর জলের অসীম মেলা।
সকালের দিকে আমাদের সুনামগঞ্জ পৌঁছাল। রাস্তার পাশে চায়ের দোকান থেকে গরম পরোটা আর ভাজির ঘ্রাণ আসছিল। আমরা চা খেতে খেতে ক্লান্তি ঝেড়ে নিলাম। এরপর সোজা চলে গেলাম টাঙ্গুয়ার হাওরের ঘাটে।
ঘাটে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল লম্বা কাঠের একটা নৌকা। মাঝখানে ছোট একটা ঘর, সামনে খোলা ডেক। মাঝি হোসেন ভাই হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন,
“দুইদিন থাকবেন? জলের মধ্যে ঘুমাবেন?”
আমরা হেসে বললাম, “এই তো সেই স্বপ্নটাই দেখতে আসছি!”
ইঞ্জিনটা গর্জে উঠল, আর ধীরে ধীরে নৌকা ভেসে গেল নীল জলের বুক চিরে। হাওরের দিগন্ত যেন শেষ নেই — জল আর আকাশ মিলেছে এক জায়গায়। চারদিকে কেবল বাতাসের শব্দ, মাঝে মাঝে পাখির ডাক। দূরে দূরে সবুজ ভাসমান দ্বীপ, পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, আর সাদা বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে।
ইঞ্জিনটা গর্জে উঠল, আর ধীরে ধীরে নৌকা ভেসে গেল নীল জলের বুক চিরে। হাওরের দিগন্ত যেন শেষ নেই — জল আর আকাশ মিলেছে এক জায়গায়। চারদিকে কেবল বাতাসের শব্দ, মাঝে মাঝে পাখির ডাক। দূরে দূরে সবুজ ভাসমান দ্বীপ, পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, আর সাদা বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে।
সূর্য উঠতে উঠতে জল চিকচিক করে উঠল। আমরা সবাই ডেকের সামনে বসে পা ডুবিয়ে জল ছুঁয়ে দিলাম। রাফি ড্রোন ওড়াতে ব্যস্ত, আরিফ বাজাচ্ছে পুরোনো বাংলা গান, সিমা লিখছে তার নোটবুকে — “জলের মধ্যে স্বাধীনতার গন্ধ আছে।” আমরা হাসলাম।
দুপুরের দিকে নৌকা ভিড়ল ভাসমান বাজারে। মহিলারা ছোট ছোট নৌকায় মাছ আর শাকসবজি বিক্রি করছেন। আমরা তাজা টেংরা মাছ কিনে আনলাম। মাঝির সহকারী সুমন নৌকার পেছনে ছোট চুলা বসিয়ে রান্না শুরু করল। একটু পরেই ভাজা মাছের গন্ধে নৌকা ভরে গেল। দুপুরের খাবার ছিল একেবারে গ্রামীণ — ভাত, ডাল, ভাজা টেংরা আর সালাদ। কিন্তু সেই মুহূর্তে এরচেয়ে সুস্বাদু কিছু হতে পারত না।
খাবার শেষে সবাই ঝাঁপ দিলাম জলে। টাঙ্গুয়ার পানি ছিল ঠান্ডা, স্বচ্ছ আর মন ভরানো। মনে হচ্ছিল, আমরা আকাশের ভেতরে ভাসছি। হাসি, চিৎকার, জল ছিটানো — কে কাকে ভেজাচ্ছে বোঝা যাচ্ছিল না। মুহূর্তটা ছিল নিখাদ আনন্দের।
বিকেলে সূর্য নামতে শুরু করল। আকাশ রঙ বদলাতে লাগল — কমলা, বেগুনি, নীল। জলে তার প্রতিফলন। মনে হচ্ছিল আমরা দুটো আকাশের মাঝে ভাসছি। কেউ বাঁশি বাজাল, কেউ গুনগুন করে গান ধরল। নৌকার ওপর সেই নরম সুরে যেন সময় থেমে গেল।
রাত নেমে এলো নিঃশব্দে। চারপাশে শুধু চাঁদের আলো আর জলের ঢেউয়ের শব্দ। আমরা নৌকা থামালাম এক ভাসমান গ্রামের পাশে। রাতের খাবারের পর সবাই ডেকে বসে গল্প করতে লাগলাম — শহরের ক্লান্তি, জীবনের স্বপ্ন, আর হাওরের শান্তি নিয়ে।
জলের টুপটাপ শব্দই ছিল আমাদের লোরি সেই রাতে।
সকালে সবাই ঘুম থেকে উঠলাম সূর্য ওঠার আগেই। জলের ওপর হালকা কুয়াশা, দূরে পাখির ডাক। কাছে এক জেলের ভাসমান ঘর থেকে গরম চা খেলাম — ধোঁয়া উঠছে, চায়ের ঘ্রাণে পুরো সকালটা অন্যরকম লাগছিল।
ফেরার সময় কেউই খুব একটা কথা বলছিল না। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটা জায়গা ঘুরে আসিনি, বরং একটুখানি জীবন ছুঁয়ে এসেছি। হাওরের জলের মতোই আমাদের ভেতরটাও শান্ত হয়ে গেছে।
তীরে পৌঁছে সবাই একবার পেছন ফিরে তাকালাম — নীল জল, দূরে পাহাড়ের রেখা, আর নরম বাতাস।














