প্রিয় লোকাল গাইডস, রমজানুল মুবারক!
পুরনো স্থাপনা বিশেষ করে রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি, মসজিদ এবং অন্যান্য হেরিটেজ সাইট ঘুরে দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আর বলতে গেলে আমি তো, “অদেখা এবং প্রাচীনকে খুঁজে বেড়াই”।
গত মাসের (ফেব্রুয়ায়রি ২০২৫) শেষ শুক্রবারে ঐতিহ্যপ্রেমী আর সমমনাদের সঙ্গে “সেভ দ্য হেরিটেজেস অব বাংলাদেশ” গ্রুপের “হেরিটেজ ট্যুর ৯৯: মানিকগঞ্জ” এ জয়েন করার অসাধারণ একটি সুযোগ হয়েছিল। ৯৯তম এই হেরিটেজ ট্যুরে নানা শ্রেণি পেশার প্রায় ৩০ জন ঐতিহ্যপ্রেমী জয়েন করেছিলেন।
খুব ভোরে রাজধানী ঢাকার কাকলী-বনানী, পিডব্লিউডি গেট এবং অন্যান্য লোকেশন থেকে আসা সকল ঐতিহ্যপ্রেমীরা প্রথমে আড়ং লালমাটিয়া বাস স্টপেজে মিলিত হয়। তারপর আনুমানিক ভোর ৬ টা ২০ মিনিটে ৩টি মাইক্রোবাস একসাথে মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এটি ছিল “সেভ দ্য হেরিটেজেস অব বাংলাদেশ” গ্রুপের সাথে আমার দ্বিতীয় হেরিটেজ ট্যুর।
এই ট্যুরে আমরা প্রায় ১২টির মতো বিভিন্ন হেরিটেজ সাইট ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। এর মধ্যে:
- শাহ সাহেব বাড়ি মসজিদ
- চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট
- শ্রী শ্রী শিব সিদ্ধেশ্বরী মন্দির
- মত্ত মঠ ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের বাড়ি
- মুখার্জি বাড়ি
- তেরশ্রী জমিদার বাড়ি
- তেওতা জমিদার বাড়ি
- মাচাইন মসজিদ
- মুন্সি বাড়ি মসজিদ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য
সকাল ৮.২০ মিনিটে আমরা আমাদের প্রথম হেরিটেজ সাইট শাহ সাহেব বাড়ি (দায়েমিয়া হাবিবা) মসজিদে পৌঁছাই। প্রাচীন এই মসজিদটি অত্যন্ত সুন্দর। মসজিদটির পাশেই রয়েছে প্রাচীন একটি মাজার এবং শাহ সুফি হাবিবুর রহমানের আস্তানা। আর তার নাম অনুসারে মসজিদ নাম হয়েছে দায়েমিয়া হাবিবিয়া জামে মসজিদ।
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট
আমাদের লিস্টে থাকা দ্বিতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থানে পৌঁছাই সকাল ৯.১৮ মিনিটে আর এটি ছিল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, মানিকগঞ্জ। এটি স্থাপিত হয় ১৯২৮ এবং পুনঃ নির্মাণ ২০০৪-০৫ সালে। এখানে। নতুন আর পুরনো ভবন রয়েছে। পুরনো ভবন একতলা বিশিষ্ট এবং নতুনটি বহুতল বিশিষ্ট ভবন। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট কোর্টের পাশেই রয়েছে শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ী মন্দির আর এটি ছিলো আমার তৃতীয় পুরনো স্থাপনা এবং সকাল ৯.৩৫ মিনিটে সেখানে যাই।
শ্রী শ্রী শিব সিদ্ধেশ্বরী মন্দির
এরপর সকাল ৯.৫২ মিনিটে চতুর্থ হেরিটেজ সাইট শিব সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে যাই। এই মন্দিরটি এ জেলার পুরাকীর্তির মধ্যে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উনিশ শতকের শেষের দিকে ও বিংশ শতকের শুরুর দিকে মন্দিরটির পরিচিতি বেড়ে যায় এবং বিখ্যাত হয়। তবুও মন্দিরটি কখন ও কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সঠিক তথ্য জানা যায় না। অনেকের মতে, মহারানী ভিক্টোরিয়ার আমলে শিব সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরটিতে মূল্যবান পাথর ও ভাস্কর্য রয়েছে।
মত্ত মঠ ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের বাড়ি
পঞ্চম হেরিটেজ সাইট মত্ত মঠে সকাল ১০.১২ মিনিটে পৌঁছাই। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন যার বয়স প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশি। অনেকের মতে, এই গ্রামে একসময় হেমসেন নামের এক অত্যাচারী জমিদার ছিলেন। তিনি তার বাবার শেষকৃত্যের স্থানে মঠটি নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, মঠ নির্মাণের জন্য ইরাক থেকে দক্ষ কারিগর আনা হয়েছিল এবং এর কারুকার্য খচিত নির্মাণশৈলী দেখলে মুগ্ধ হওয়ার মতো। মঠের সাথেই রয়েছে বিশালাকার একটি দীঘি। দূর থেকে মঠ আর দীঘি একসাথে দেখতে বেশ চমৎকার লাগে। মত্ত মঠ থেকে মাত্র ৪-৫ মিনিট হেঁটেই যাওয়া যায় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের পৈতৃক বাড়িতে। এই বাড়ির কাছেই রয়েছে ১৯৭১ সালে স্থাপিত মত্ত উচ্চ বিদ্যালয়।
মুখার্জি বাড়ি
এরপর প্রায় ২১ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে সকাল ১১.২৫ মিনিটে চলে আসি মুখার্জি বাড়ি দেখতে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মহাদেবপুর বাস স্টপেজ থেকে মাত্র ১-২ মিনিটের পথ হেঁটে গেলেই পুরনো এই বাড়িতে যাওয়া যায়। এখনো মুখার্জি বাড়িতে তাদের বংশধরেরা বসবাস করছেন এবং কয়েকজনের সাথে কথা হয়েছিল। তারা বেশ আন্তরিক। মুখার্জি বাড়ির একটি বাড়িতে ১৩০১ সাল এবং অন্য একটি বাড়িতে ১৩১৮ সন লিখা দেখাতে পাওয়া যায়। স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায় যে, এই সালে বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। এই বাড়িতে সেই সময়ের (খুব সম্ভবত কলোনিয়াল সময়ে) টয়লেটের ছাদে থাকা ব্যাঙ্গমা আকৃতির প্রাণীর মূর্তি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মুখার্জি বাড়ি ছিল আমাদের ষষ্ঠ হেরিটেজ সাইট।
আমাদের সপ্তম হেরিটেজ সাইট হিসেবে গন্তব্য ছিল তেরশ্রী জমিদার বাড়ি। দুপুর ১২.১৫ মিনিটে এ বাড়িতে এসে পৌঁছাই। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী ছিল শিক্ষানুরাগী, হিন্দুপ্রধান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। তেরশ্রী জমিদার বাড়ি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী তৎকালীন সময়ে এই এলাকার জমিদার ছিলেন। পরবর্তীতে তার ছেলে সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধূরী জমিদারির দায়িত্ব পালন করেন এবং সফলভাবে পরিচালনা করেন। তিনি একাধারে ছিলেন শিক্ষানুরাগী, সমাজ সেবক ,জনদরদী, পরোপকারী। অসহায় ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সেবা করে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি নিজ জায়গায় নিজ অর্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধূরী ব্যাপক ভুমিকা রাখেন এবং পাক হানাদার বাহিনীরা তাকে খুবই নির্মম ভাবে হত্যা করে।
বর্তমানে এই জমিদার বাড়ির পুরনো গেট এবং কাচারি ঘরের একাংশ টিকে আছে। তাদের বংশধরেরা এখনো এখানে বসবাস করছেন। এই জমিদার বাড়িতে যাওয়ার পথে ১৯৬৫ সালে স্থাপিত তেরশ্রী ডিগ্রি কলেজ চোখে পড়ে।
জুমার নামাজ এবং দুপুরের খাবারের বিরতির পর বিকাল ৪ টার দিকে আমরা চলে যাই ঐতিহ্যপ্রেমী আর ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ তেওতা জমিদার বাড়িতে। এই জমিদার বাড়িটি মানিকগঞ্জ জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে অবস্থিত। জমিদার বাড়িটি প্রায় ৭.৩৮ একর জমি নিয়ে স্থাপিত।
এই জমিদার বাড়ির নির্মাতা পঞ্চানন সেন নামক একজন জমিদার। জমিদার বাড়ির স্থাপত্যশৈলী সবাইকে মুগ্ধ করবে। জমিদার বাড়ির মূল ভবনটি লালদিঘি ভবন নামে পরিচিত এবং এর চারপাশে আর বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা ও একটি বড় পুকুর রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে নবরত্ন মঠ ও মন্দিরসহ আরও কয়েকটি মঠ। সবগুলো ভবন মিলিয়ে মোট ৫৫টি কক্ষ রয়েছে। জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার কারণে দিনে দিনে এর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে। জমিদার বাড়ি এবং নবরত্ন মঠ ছিল আমাদের অষ্টম এবং নবম হেরিটেজ সাইট।
বিকাল ৫.২০ মিনিটে চলে আসি মাচাইন গ্রামের ঐতিহাসিক মাচাইন শাহী মসজিদ দেখতে। মসজিদটি দশম হেরিটেজ সাইট হিসেবে আমাদের লিস্টে ছিল যা মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য ও পুরাকীর্তি। প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো মাচাইন শাহী মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট। তিনটি গম্বুজের মধ্যে মাঝেরটি তুলনামূলকভাবে বড়, এবং উত্তর ও দক্ষিণ পাশের দুটি গম্বুজ অপেক্ষাকৃত ছোট। দিনে দিনে মুসল্লিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পুরোনো মসজিদের পশ্চিমাংশ অক্ষুণ্ন রেখে পূর্বদিকে সম্প্রসারণ করে এর জায়গা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মসজিদের পাশেই রয়েছে হযরত শাহ্ রুস্তম বাগদাদী (রঃ) এর মাজার শরীফ ও একটি ঈদগাহ মাঠ।
মাচাইন শাহী মসজিদ থেকে মাত্র ৫-৭ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসি ১১তম হেরিটেজ সাইট মুন্সি বাড়ি জামে মসজিদে। অনেকে এই মসজিদটিকে মিয়া বাড়ি মসজিদ নামেও ডেকে থাকে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০০ বছর আগে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটির ডিজাইন বেশ চমৎকার। “আল্লাহ” লেখা প্রবেশদ্বার দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। মসজিদের অভ্যন্তরে মিহরাবের পাশেই একটি শিলালিপি দেখা যায়। যদিও মসজিদটির সংস্কার কাজ করা হয়েছে, তবুও এটি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। ঐতিহাসিক এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি দেখতে প্রায় প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন।
পরিশেষে প্রসন্ন নাথ রায় মঠ এবং মালুচি রায় জমিদার বাড়ি পরিদর্শনের মাধ্যমে মানিকগঞ্জ হেরিটেজ ট্যুরের সমাপ্তি হয়।
মানিকগঞ্জ জেলায় হেরিটেজ ট্যুর ছিল আমার জন্য এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা, যেখানে ঐতিহ্যপ্রেমী ও সমমনাদের সঙ্গে ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ফলে এই হেরিটেজ ট্যুরকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের ট্যুরের প্রতিটি স্থান এ অঞ্চলের অতীতের সাথে জড়িয়ে থাকা গল্পগুলো আমাদের অভিজ্ঞতাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। মানিকগঞ্জ হেরিটেজ ট্যুরে অংশ নেওয়া সবাইকে, বিশেষ করে সাজ্জাদুর রশীদ স্যারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাদের উপস্থিতি ও সহযোগিতায় এই ট্যুরকে আরও স্মরণীয় করে রেখেছে।
#HappyTraveling #HappyGuiding












