চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মিরসরাই জুড়ে থাকা বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের এই রেঞ্জের সবগুলো ঝর্ণা (প্রকৃত শব্দ ঝর্ণা নয়, ‘জলপ্রপাত’ হবে) ই বেশ সুন্দর। এরমধ্যে ঝরঝরি ট্রেইলটাকে সবচেয়ে বড় বলে ধরা হয়, এবং সৌন্দর্যের বিবেচনায়ও এই ট্রেইলটা উপরের দিকে থাকবে।
গত আগস্টে ভাইবেরাদররা মিলে কোথাও যাওয়া দরকার দরকার বলে শোরগোল হচ্ছিল, এরমধ্যে কোথায় যাওয়া হবে এটা নির্ধারিত না হওয়ায় আমি একটু বেঁকে বসলাম যে যাবো না! এরপরেই ঝরঝরি নির্ধারিত হলো, আমি তো খুব খুশি কারণ এই ট্রেইলে আমার আগে আসা হয় নাই।
ট্রেইল সুন্দর হলে আমার একাধিকবার যেতে আপত্তি নাই কিন্তু না যাওয়া ট্রেইল হলে তো সেটাই প্রাধান্য পাবে!
রাতে বাসা থেকে খেয়ে দেয়ে বের হয়ে আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে চলে গেলাম আমরা, জুয়েল ভাই সন্ধ্যায় এসে টিকেট কেটে রেখেছিল। রাত ১১:৫০ এ বাস রওনা হলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে! ভোরের আলো ফোঁটার কিছু পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম পন্থিছিলা বাজারে। সেখানে সকালের নাস্তা করে ব্যাগের ওজন কিছুটা কমিয়ে রেখে এবার হাঁটার পালা। কিছুটা হাঁটলেই রেললাইন। এখানেই পাকা রাস্তা শেষ, কারণ রেললাইন ধরে কিছুটা পথ হাতের পথ বাম দিকে (উত্তরদিকে) যেতে হবে, সেখানে গ্রামের রাস্তা। কিন্তু ওখান থেকে ঝিরি পর্যন্ত ১ কিলোমিটার+ রাস্তা পুরো কাদায় মাখামাখি! যেটা সবাইকেই কিছুটা কাহিল করেছিল, কিন্তু ঝিরিতে নেমেই সবাই আবার চাঙা!
ঝরঝরি ট্রেইলের কিছুটা ঝিরি, কিছুটা পাহাড় বেয়ে মূল ঝিরিতে যেতে হয়, একদম নতুন একজন/গ্রুপ গেলে স্থানীয় গাইড নিয়ে যাওয়া বেটার, তবে আমাদের টিমে থাকা জুয়েল ভাই, রাফি একাধিকবার এই ট্রেইলে এসেছেন, সেজন্য আমরা আর গাইড নেই নাই।
ট্রেইলে সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এক জায়গায় এসে রাফি বলল এখানে (বাম পাশে) পাহাড়ে উঠতে হবে! কাদা এবং কিছুটা খাঁড়া হওয়ায় একেবারে স্বাচ্ছন্দ্যে ওঠা যায় নাই! অর্ধেকটা ওঠার পরেই টের পেলাম আমরা পাতলা মেঘের স্তরে উঠে গেছি! (প্রকৃতপক্ষে বর্ষাকাল হওয়ায় মেঘের স্তর নিচে নেমে এসেছিল)। নামার সময় ওখান থেকে দেখলাম চন্দ্রনাথ মন্দির (এই রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া), বিরুপাক্ষ মন্দির স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! অভূতপূর্ব দৃশ্য ![]()
এই কাদামাখা পাহাড় বেয়ে ওঠার পরে অনিন্দ্য সুন্দর টেইলে এবার হেঁটে চলা। কিছুটা পথ হাঁটতেই প্রথম জলপ্রপাতটি পাওয়া গেল যেটি ‘ঝরঝরি ঝর্ণা’ নামেই বেশি পরিচিত।
ওখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে, ছবি & ভিডিও তুলে এবার উপরে রওনা হওয়ার পালা। এবারও পাহাড়ে ধার ধরে উপরে উঠতে হল, কারণ ট্রেইলে পানি এবং কয়েকটা জায়গা ট্রেইল দিয়ে গেলে বেশি রিস্কি। ওই জায়গাটুকু আমরা পাহাড় দিয়ে গিয়ে আবার ট্রেইলে নামলাম।
এই ট্রেইলের যেটা বেশি ভালো লাগলো সেটা হচ্ছে ট্রেইলটা বেশ চওড়া এবং অনেক গাছপালা, সাথে বোল্ডারগুলো বেশ বড়সড়।
ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম ডেভিল’স ফল বা মূর্তি ঝর্ণা এর কাছে! এখানে পাথর ভেঙে ঝর্ণার চেহারাটা কিছুটা মানুষের মতো, কিন্তু ভয়াবহ পানির স্রোত! ফলসের কাছাকাছি যাওয়ার আগেই আমি একবার, পরে শান্তা আপুও ছোটখাটো আছাড় খেলেন। প্রায় বুক সমান পানি উতরিয়ে ডেভিল’স ফলের বেদিতে উঠলাম আমরা। এবার এর উপরে ওঠার পালা কিন্তু এই স্রোত উতরায়ে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য হবে মনে হচ্ছিল। জুয়েল ভাই একদফা চেষ্টা করে পেছনে আসলো, আমিও একদফা চেষ্টা করে অসফল হয়ে পেছনে আসলাম। পেছন থেকে টুসি আপু বলতেছিল উনি এর আগেরবার যখন এসে ছিলেন তখন উঠেছিলেন, কিন্তু সেবার এতো পানির প্রবাহ ছিল না। এর মধ্যেই দেখলাম শাওন ভাই প্রবল পানির প্রবাহ অতিক্রম করে উপরে উঠে গেছেন! এটা দেখে মনে সাহস বাড়ল, ভাবলাম আরেক দফা চেষ্টা করা যাক! কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে স্রোতের সাথে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে শাওন ভাইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানে পা ফেলে দিলাম নিজেকে ধাক্কা! পরমুহূর্তেই নিজেকে প্রবল পানির প্রবাহের উপরে আবিষ্কার করলাম! এরপর একে একে শান্তা আপু, তৌফিক ভাই, টুসি আপু, জুয়েল ভাই, রাফি উপরে উঠল। মনির ভাই শারীরিক উচ্চতায় কিছুটা কম হওয়ায় রিস্ক মনে করে আর উঠলেন না! একই ঘটনা ঘটল আতিয়া আপুর ক্ষেত্রে, এবং আতিয়া আপু যেহেতু উঠল না ওনার স্বামী শামীম ভাইও উঠলেন না।
আমরা এবার একটু উঠেই আরেকটা প্রসস্থ জলপ্রপাতের দেখা পেলাম, যদিও এটাকে ক্যাসকেড বলাই ভালো!
এরমধ্যে পানির বেশ প্রবাহ দেখে অনুমান করলাম সামনে আরও জলপ্রপাত আছে! কিন্তু টিমের সবাই পেছনে পড়ে যাওয়ায় সামনে আগাবো কি আগাবো না এই দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম! আমি অবশ্য প্রায় ৩শ মিটার একা গিয়ে দেখে আসছি! কিন্তু একা অচেনা ট্রেইলে যাওয়া রিস্কি বিধায় টিমের কাছে ফেরত এলাম! আসার পরে রাফি বলতেছে ভাই চলেন সামনে যাই, সামনে আরেকটা সুন্দর জলপ্রপাত আছে! কিছুটা উল্লসিত কণ্ঠে বললাম পানির প্রবাহ দেখে আমারও সেরকম মনে হচ্ছে! চলো আগাই! এরমধ্যে শাওন ভাই, শান্তা আপু এসে পড়লেন। জুয়েল ভাইসহ বাকি ৩ জন পেছনে আসতে থাকলো। আমরা চারজন এগিয়ে চললাম, পুরো ট্রেইলে আমরা ৪ জন ই! একেবারে গা ছমছমে ব্যাপার! ![]()
বেশ খানিকটা হাঁটার পরে দেখা পেলাম জলপ্রপাতটার, আমরা বিশ্রাম করছি আর ছবি তুলছি এমন সময় জুয়েল ভাই এসে জানাইলেন এটাই মইন্নার মা’র ঝর্ণা/খুম। জলপ্রপাতের পানি পড়ে ওখানে একটা খুমের মতো তৈরি হয়েছে। যদিও পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছিল এর উপরে আরও কিছু আছে! কিন্তু জুয়েল ভাই বললেন এই ট্রেইলে এটাই শেষ।
এদিকে মনির ভাইসহ ৩ জনকে ডেভিল ফলসের ওখানে রেখে আসায় আমরা কিছুটা গোছল করে নিচে চলে আসলাম।
যদিও চলতে চলতে কয়েক দফা ভিজেছি, কিন্তু রিলাক্সে ভেজার জন্য আমরা আবার নিচে নেমে ঝরঝরি জলপ্রপাতের কাছে চলে এলাম। ওখানে শুয়ে বসে ল্যাটায়ে, সাঁতরায়ে সবাই প্রকৃতির অমিয় সুধা পান করলাম। সাথে অবশ্য কাঁচা জাম্বুরা আরও কি কি যেন খাওয়া হল! এর আগে ডেভিল’স ফলস থেকে নেমে অবশ্য কলা, কেক, খেজুর খাওয়া হয়েছিল।
মনভরে ভিজে এবার ফেরার পালা! ওই কাদামাখা পথ আবার মাড়াইতে হবে ভেবেই খারাপ লাগছিল! কিন্তু অত্যন্ত অবাক করা বিষয় প্রচণ্ড রোদ ওঠায় ওই প্যাঁচ পেঁচে কাদা ফেরার পথে আর ছিল না। বরং বেশ কিছু জায়গায় মানুষ হাঁটায় কিছুটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল, ফলে একেবারে কাদা এবার মাড়াইতে হয় নাই!
পথে ফিরতে ফিরতে সিদ্ধান্ত হল আজকে আর অন্য কোনো ট্রেইলে যাবো না, বরং ছোট কমলদহ গিয়ে ড্রাইভার হোটেলে ভাত খাবো।
সবাই এটাতে রাজি হওয়ায় ড্রাইভার হোটেলে গিয়ে গরুস মাংস, মাছ, ভর্তা, ডাল দিয়ে খেয়ে আর চলার শক্তি নাই!
এরমধ্যে নিজামপুর এসে ঢাকার বাসের টিকেট কাটলাম! জুয়েল ভাই অল্প টাকায় একটা এসি বাসে ভালো ডিল খুঁজে বের করলেন, যেটা উত্তরা/আব্দুল্লাহপুর যাবে! ফলে আমাদের জন্য ভালো। কিন্তু ভ্রমণ মানেই নতুন কিছু! এবারও তাই হল! বাস আমাদের ৯ (+ কাউন্টারে আরেকজন) যাত্রীকে না তুলেই চলে গেল! এবং ২০/৩০ মিনিট পরে তাদের হুশ ফিরল যে যাত্রী তো তোলা হয় নাই! সেই বাস প্রায় ৩০ কিলোমিটার আবার পেছনে এসে আমাদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হল!
রাস্তায় কিছুটা যানযট থাকায় আমরা রাত ১ টায় ঢাকায় ফিরলাম। এরপরে একটা রিকশা নিয়ে বাসায় এসেই ঘুম!
আপনি কি ঝরঝরি ট্রেইলে বা বারৈয়ারঢালা এই রেঞ্জের কোনো জলপ্রপাতে গিয়েছেন? ক্যামন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?
অসংখ্য ধন্যবাদ পড়ার জন্য,
আপনার দিনটি শুভ হোক ![]()
