সিকিম ভ্রমণ: প্রথম পর্ব

সিকিমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সিকিম হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। একদিকে চীন আরেকদিকে ভুটান এবং অন্যদিকে নেপালের বর্ডার বেষ্টিত রাজ্য এটি। আয়তনে খুব ছোট হলে ভারতের নিকট এটি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি রাজ্য।

আমার দেখা খুবই পরিচ্ছন্ন একটি রাজ্য এটি। রাস্তাঘাটে কোথাও কোনো ময়লা আবর্জনা পরে থাকতে দেখিনি । রাস্তাঘাটও খুবই সুন্দর।

গ্যাংটক হচ্ছে সিকিমের রাজধানী। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৫৬০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। খুবই মনোরম এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি শহর। এম জি মার্গ হলো শহরের প্রাণকেন্দ্র এটি অনেকটা সিমলার মলরোডের মত। দুপাশে সারিবদ্ধ দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের সমারোহ। এককথায় পরিপাটি একটি এলাকা।

গ্যাংটকের আসে পাশে অনেক গুলো দর্শনীয় স্থান আছে। তবে সিকিমের মূল আকর্ষণ হলো নর্থ সিকিমের লাচুং জিরো পয়েন্ট, ইয়ামথাং ভ্যালি। আরেকটা আকর্ষণ হচ্ছে ছাঙ্গু লেক। সিকিমে আসলে মোটামুটি ৫-৭ দিন সময় নিয়ে আসতে হবে। ছুটি কাটানোর জন্য সিকিম অনেকেরই পছন্দের জায়গা।

ভ্রমণ পরিকল্পনা

একটি যথাযথ পরিকল্পনা না থাকলে ভ্রমণে অনেক অসুবিধা হতে পারে। আমার ভ্রমণের সমস্ত পরিকল্পনা আমি নিজেই করি। ভালো পরিকল্পনা করতে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। ইন্টারনেট থাকাতে তথ্য সংগ্রহ করা এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গেসে।

কোথায় যাবেন, কি ভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কি কি দেখবেন ইত্যাদি বিষয়গুলো আগে থেকেই সাজিয়ে নিতে হয়। আমার জানামতে ২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশিদের জন্য সিকিম ভ্রমণের অনুমতি ছিল না। যখন থেকে জানতে পারলাম বাংলাদেশিদের জন্য সিকিম ওপেন হয়েছে সেদিন থেকেই মাথায় পোকা ঢুকেছে যে সিকিম যেতেই হবে। কিন্তু সময় সুযোগ করতে পারছিলাম না। মাঝে করোনা মহামারীর কারণে সবকিছু আবার বন্ধ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে ভাগ্য সহায় হচ্ছিলো না।

অবশেষে ২০২৩ সালে এসে জেদ ধরলাম এবার যাবোই। অনেককেই অফার করলাম সঙ্গে যাওয়ার জন্য কিন্তু তেমন কোনো সারা শব্দ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে একাই যাবার সিদ্ধান্ত নেই। এর মধ্যে আমার অফিসের একজন কলিগ আমার সাথে যুক্ত হয়। সিকিম যেতে হলে আপনি একা একা ঘুরতে পারবেন না। আপনাকে গ্রুপ করেই ঘুরতে হবে। কারণ বিদেশিদের জন্য সিকিমে অনেক নিয়ম কানুন। বিভিন্ন ধরণের পারমিশন লাগে।

গ্রুপে ৭/৮ জন হলে সবচেয়ে কম খরচে ঘুরে যায়। কারণ আপনাকে পুরো গাড়ি ভাড়া করতে হবে। জিপ গাড়িতে ৭/৮ জন আরাম করে বসা যায়। এই জন্য ৭/৮ জনের গ্রুপ হলে খরচ সাশ্রয় হয়। তাই আমি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ভ্রমণসঙ্গী খুঁজতে লাগলাম, কয়েকজনকে পেয়েও গেলাম। তাদেরকে প্ল্যান শেয়ার করার পর রাজি হয়ে যায়। আমরা মোট ৮ জনের গ্রুপ।

আমাদের ফাইনাল প্ল্যান যা সংক্ষিপ্ত আকারে অনেকটা এরকম মার্চ ১০ তারিখ রাতে ঢাকা থেকে রওয়ানা দিবো সিকিম ঘুরে দার্জিলিং হয়ে শিলিগুড়িতে থাকবো। ১৭ তারিখে আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো। শনিবার সকালে ঢাকায় থাকবো। সাথেই থাকুন পুরো ট্রিপের বর্ণনা দিবো একে একে।

ভারতের ভ্রমণ ভিসা

আমি সাধারণত ভারতের পর্যটক ভিসার জন্য আবেদন করি ভ্রমণের এক দেড় মাস আগে। হাতে একটু সময় নিয়ে করা ভালো এতে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। প্রথমবার ভিসা না পেলেও আবার আবেদনের সময় হাতে রাখা উচিত। ভিসা কিভাবে করবেন তা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বললাম না। এখন অনেক সহজ হয়ে গেসে নিজে নিয়েই আবেদন করা যায়। প্রচুর ভিডিও পেয়ে যাবেন এ বিষয়ের। এই ওয়েবসাইট https://www.ivacbd.com/ থেকে আপনারা আবেদন করতে পারবেন। সাধারণত ১৫-২৫ দিনের মধ্যেই ভিসা হয়ে যায়। আমরা চ্যাংড়াবান্ধা দিয়ে ভিসা করেছিলাম কারণ বাংলাবান্ধা পোর্ট বন্ধ ছিল। বাংলাবান্ধা দিয়ে গেলে আপনাদের সময় প্রায় ২ ঘন্টা বেঁচে যাবে।

সিকিম প্রবেশের অনুমতি (ILP)

সিকিম একটি রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া। তাই আপনাকে ভিসা থাকার পরও সিকিমে প্রবেশের আলাদা করে অনুমতি নিতে হবে যেটাকে ILP (Inner Line Parmit ) বলে। এটি ছাড়া আপনি সিকিমে ঘুরতে পারবেন না। এই পারমিট অনেক জায়গা থেকেই নেয়া যায়। আমরা শিলিগুড়ি SNT থেকে নিয়েছিলাম। চলুন যেতে যেতে বিস্তারিত কথা হবে।

যাত্রার প্রস্তুতি

আমি শুরুতেই বলেছিলাম যে ভ্রমণের জন্য একটি ভালো পরিকল্পনা থাকা জরুরি। যাত্রার প্রস্তুতি কেমন হবে তা নির্ভর করে আপনি কোথায় যাচ্ছেন তার উপর । ধরুন আপনি বান্দরবান ট্রেকিং এ যাবেন তাহলে আপনার প্যাকিং হবে একরকম আবার আপনি তাজমহল দেখতে যাবেন তাহলে আপনার প্যাকিং হবে আরেকরকম। যেখানেই যাবেন সেই জায়গার আবহাওয়া অনুযায়ি পোশাক-আশাক নিতে হবে। মার্চ মাসে আমাদের দেশে কাঁঠাল পাকা গরম পড়লেও সিকিমে শীত থাকে। কাপড়-চোপড় ধোয়ার কোনো চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেন। কারণ যে ঠান্ডা কাপড় শুকাবে না। তাই প্রতিদিনের জন্য আন্ডার গার্মেন্টস এবং পা মুজা নিতে হবে। হালকা এবং ভারী দুটো শীতের পোশাক নেয়া ভালো। কেউ না নিয়ে গেলে অসুবিধা নাই গ্যাংটকে প্রচুর দোকান আছে আপনারা চাইলে ঐখান থেকেও কিনতে পারেন। ঢাকা থেকে বুড়িমারি অনেক বাস যায়। আমরা কয়েদিন আগেই বাসের টিকেট করে রাখলাম।
উল্লেক্ষ যে আমাদের এবারের ট্যুরে আমরা ৩ জন ব্যাচেলর ২ জন কাপল এবং একটি ফ্যামিলি যাবে। আমরা ৩ জন একসাথেই যাবো বুড়িমারী পর্যন্ত বাকিরা ঐখানে এসে আমাদের সাথে জয়েন করবে ।

যাত্রাশুরু (১০-০৩-২৩)

আমাদের বাস মহাখালী থেকে ছাড়বে রাত ৮:৩০ টায় । আমার সফরসঙ্গী ফয়সাল ঐখান থেকেই উঠবে। আমি উঠবো আজমপুর থেকে আরেকজন উঠবে আব্দুল্লাপুর কাউন্টার থেকে। আমি বাসা থেকে বিদায় জানিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে রওয়ানা দেই । যথা সময়ে আমরা সবাই যার যার কাউন্টার থেকে বাসে উঠে পড়ি। জ্যাম ঠেলে বাস চলছে টঙ্গীর দিকে। অবশেষে রাত ২ টার দিকে আমরা ফুড ভিলেজ বগুড়াতে পৌঁছাই। এখানে ৩০ মিনিট এর বিরতি। আমরা নেমে খেয়েদেয়ে আবার বাসে উঠে পড়লাম। বাস আবার চলা শুরু করলো। রাস্তায় কাজ চলছে তাই প্রচন্ড ঝাকুনি। আমি চলন্ত বাসে এমনিতেই ঘুমাতে পারিনা তার মধ্যে সেই ঝাকুনি হচ্ছে। এর মধ্যেই অনেকে দেখি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে OMG!। বাস রংপুর হয়ে লালমনিরহাটের দিকে টার্ন নিলো ঘড়িতে তখন ৪ টা । দেখতে দেখতে সকাল ৮ টার দিকে আমরা বুড়িমারী পৌঁছাই। খুবই বাজে একটি বাস জার্নি ছিল। প্রায় ১১ ঘন্টা লাগলো। নেমে কাউন্টারে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কাউন্টারে পাসপোর্ট এবং টাকা দিয়ে দিলাম ওরাই ট্রাভেল ট্যাক্স, পোর্ট ফি এবং ইমিগ্রেশনসহ সব বাংলাদেশ অংশের সব আনুষ্ঠানিকতা ম্যানেজ করে দিবে। আমরা নাস্তা খেতে বুড়ির দোকানে গেলাম। এর মধ্যে গ্রুপের বাকি লোকজনও চলে আসলো।

১ম দিন (১১-০৩-২০২৩)

ল্যান্ড পোর্ট গুলো ৯ টায় খুলে। আমরা সবাই রওয়ানা দিলাম ইমিগ্রেশন এর জন্য বিশাল লাইন এখানে। আমাদের ঘন্টাখানেক লাগলো বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এর কাজ সারতে। এবার ওপারে যাওয়ার পালা। ওহ নিজেকে একটু হাল্কা লাগছে। বিদেশের মাটিতে পা রাখতে যাচ্ছি। আমার কাছে এটি বেশ রোমাঞ্চকর অনুভূতি।

ওপারে ভারতের অংশেও ব্রোকার আছে ওরাই আপনার সব কাজ করে দেবে। আমরা গিয়েই টাকা ভাঙালাম। ১০০ টাকায় ৭৫.৩০ রুপি করে পেয়েছিলাম। এখানেও ঘন্টাখানেকের মধ্যে সব ফর্মালিটিজ শেষ করলাম।

আমাদের আজকের গন্তব্য গ্যাংটক। গ্যাংটক যেতে হলে আপনাকে শিলিগুড়ি হয়ে যেতে হবে। শিলিগুড়ি থেকে বাস, রিজার্ভ গাড়ি, শেয়ার্ড জিপ সব কিছুই পেয়ে যাবেন। আমরা ঠিক করলাম শিলিগুড়ি বাসে যাবো। তাই টোঁটোঁ ভাড়া করে ময়নাগুড়ি বাইপাসে চলে যাই। কিন্তু বাসগুলোর অবস্থা দেখে আর ভালো লাগলো না। তাই ঐখান থেকেই একটি জিপ পেয়ে গেলাম মাত্র ১০০০ রুপিতে। নরমালি ভাড়া প্রায় ২০০০/২৫০০ রুপি। আসলে ফাঁকা জিপটি যাচ্ছিলো শিলিগুড়ি। তাই ড্রাইভার আমাদেরকে এতো কমেও নিয়ে নিলো। যাইহোক আমরা প্রায় ২ ঘন্টার মধ্যে শিলিগুড়ি পৌঁছে যাই। ঘড়িতে তখন বেলা ১টা। ভাড়া পরিশোধ করে আমরা শিলিগুড়ি SNT এর ভিতরে চলে যাই। এখন আমাদের সিকিমের জন্য ILP নিতে হবে। ১০ রুপি নিলো ফরমের দাম। এক কপি করে ছবি লাগলো আর পাসপোর্টের বিবরণ, কতদিন থাকতে চাই ইত্যাদি ইনফরমেশন দিয়ে দিতে হয়। ফরম জমা দিতেই সিল দিয়ে দিলো। ব্যাস পারমিট পেয়ে গেলাম। সহজ না?

টিমের সবাই ক্ষুধার্থ, মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিতে হবে। তার সাথে সাথে গাড়িও রিজার্ভ করতে হবে অনেক… কাজ। আমি সিম কিনে নিলাম এয়ারটেল। ননভেজ থালি নিলাম সবাই। ভাত, মুরগির মাংস, সবজি, ডাল দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। এবার আসল কাজ গাড়ি ভাড়া করা। মাগার সেই গাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে আমাদের জান খারাপ হয়ে গেসিলো। এখানে সিন্ডিকেট থেকে গাড়ি না নিলে গাড়িই পাওয়া যাচ্ছে না। দালাল দিয়ে ভরপুর। দালালদের কাজ হচ্ছে আপনাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা প্যাকেজ দেয়া। সেই প্যাকেজ নিলে জীবনের চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়বেন। একবার এদিক একবার ওদিক যাচ্ছি কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। কোনো একটা ঝামেলায় গ্যাংটক ফেরত গাড়িগুলো আটকে আছে আর সেই সুযোগে দালাল চক্র আমাদের পেয়ে বসেছে। যাইহোক অকেনক ভোগান্তির পর ৫ টার দিকে একটা গাড়ি বেশি ভাড়া দিয়েই ঠিক করি কারণ আমাদের হোটেল বুকিং দেয়া ছিল গ্যাংটকে। রাট ৮ টার মধ্যে রংপো পৌঁছাতে না পারলে এন্ট্রি সিল নিতে পারবো না। সবকিসু বিবেচনা করে আমরা বেশি টাকা দিয়েই রাজি হয়। ঠিক রাত ৮ টার দিকে আমরা রংপোতে পৌঁছাই। রংপো চেকপোস্ট এ আপনাকে এন্ট্রি সিল নিতে হবে। ILP এবং পাসপোর্ট দিলে ওরা আপনার পাসপোর্টে এন্ট্রি সিল দিয়ে দিবে। এই এন্ট্রি সিল ছাড়া আপনি সিকিমে অবৈধ। অবশেষে প্রায় ১০ টার দিকে আমরা গ্যাংটক পৌঁছাই। পথে গাড়ি নষ্ট হয়েছিল আমরা ডিনার সেরে নিয়েছিলাম ঐখানেই। ঢাকা থেকে গ্যাংটক প্রায় ২৪ ঘন্টার জার্নি ছিল। হোটেলে চেক ইন করে ফ্রেশ হয়েই ঘুম। আজকে আর কোনো কথা নাই।

টিপস :[ গ্যাংটকের হোটেল ঢাকা থেকেই বুক করে যাওয়া ভালো। আমি Agoda থেকে বুক করে যাওয়ায় অনেক সুবিধা হয়েছিল। এতো জার্নি করে ক্লান্তি নিয়ে আর হোটেল খুজাখুজি করতে হয়নি। শিলিগুড়িতে দালাল থেকে সাবধান থাকবেন কোন প্যাকেজ ওদের কাছ থেকে নিবেন না । শিলিগুড়ি টু গ্যাংটক জিপ ভাড়া ৪০০০ রুপি কিন্তু আমরা ৫২০০ রুপিতে নিয়েছিলাম দালালদের কারণে। গ্যাংটকে হোটেল ভাড়া মান অনুযায়ী ১০০০ থেকে ৩০০০ রুপি নিবে। আমি দু রাতের জন্য ৩৪০০ রুপি দিয়ে নিয়েছিলাম। গ্যাংটকে আমাদের হোটেল ছিল Sharolyn Boutique Hotel

এমজি মার্গের কাছাকাছি হোটেল নিতে চেষ্টা করবেন। আমাদের হোটেল থেকে মাত্র ২ মিনিট হাঁটলেই এমজি মার্গ। ]

To be continue…

15 Likes

Hi @MazharTraveler ,

Thank you for sharing! Your post is now available on Connect. I would like to apologize for your post being marked as spam. You can visit this article to learn more - Why was my Connect post marked as spam?

3 Likes

Thanks a lot @InaS

1 Like

@MazharTraveler ভাই, সুন্দর পোস্ট। বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

কানেক্ট এ আপনাকে দেখে অনেক ভালো লাগছে। আশাকরি এখানে নিয়মিত থাকবেন।

1 Like

Nice post @MazharTraveler Sikkim is really beautiful State of BHART. :sparkles:

1 Like

@rashedul-alam ধন্যবাদ ভাই। আপনাকে দেখেই এখানে আসলাম।

1 Like