সুলতান’স ডাইনের সুস্বাদু খানার ইতিহাস আজকের নয়। একশো দশ বছরের পুরাতন এক কার্স। সুলতানস ডাইন এবং গত কয়েকদিনের মিম বুঝতে হলে, আপনাকে একশো দশ বছরের হিস্ট্রি দুই মিনিটে পড়তে হবে।
একশো বছর পূর্বেও এমন রেস্টুরেন্ট ছিল না। কারণ ফসল-খাদ্যের অভাব ছিল। পুরোপুরি প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নির্ভর করতে হতো। উদ্ভিদ নিজে যতটুকু চেষ্টা করে, প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভর করে, নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়া যতটুকু অ্যামোনিয়া দিয়েছে, ততটুকুতেই চালিয়ে নিতো। ফসল ফলাতো।
সেটুকু ইউরিয়া পেতেও উদ্ভিদকে অপেক্ষা করতে হতো ঝড়-বৃষ্টির। শুধু ঝড়-বৃষ্টি নয়, বজ্রপাতসহ বৃষ্টি। বজ্রপাতের উচ্চ তাপমাত্রা বায়ুস্থ নাইট্রোজেনকে বিভিন্ন প্রসেসের মাধ্যমে উদ্ভিদের দেহে পাঠাতো। উদ্ভিদ নিজে বাড়তো, ফল দিতো।
এরপর এলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউরিয়া। বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার হলো। এরমধ্যে একটা হলো- হেবার পদ্ধতি। শুধুমাত্র অ্যামোনিয়া বা ইউরিয়া সার আবিষ্কারের পরেই পৃথিবীর পরিস্থিতি এক ঝলকে বদলে গেল। উইকিপিডিয়া পর্যন্ত একটা হিউমারাস বাক্য লিখেছে।
the Haber process serves as the “detonator of the population explosion”, enabling the global population to increase from 1.6 billion in 1900 to 7.7 billion by November 2018.
খেয়াল করুন- খাদ্য-যৌনতা-বংশবৃদ্ধি সবগুলো একটার সাথে আরেকটা লিংকড।
ইউরিয়া হলো উদ্ভিদের প্রধান খাদ্য। উদ্ভিদের দেহের বৃদ্ধি-ফসলের পরিমাণ ইউরিয়ার উপর এককভাবে নির্ভরশীল। যখনই হেবার নামের এক ভদ্রলোক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউরিয়া আবিষ্কারের পদ্ধতি আবিষ্কার করলো, খাদ্য এক বিপ্লব ঘটে গেল। অল্প জমি-অল্পপানি-অল্পশ্রম কিন্তু প্রচুর খাদ্য। ধীরেধীরে খাদ্যে পৃথিবী স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া শুরু করলো। শুরুতে যে খাদ্য শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর জন্য খাওয়া হতো, সেই খাদ্য হয়ে গেল সহজলভ্য।
এরপর- ঘরভর্তি খানা থাকলেও খুব একটা কাজের কাজ হলো না। মানুষের জিহবা নিজেদের রান্নার হাতের সাথে করলো বেইমানী। ঘরের খানায় জিহবা সন্তুষ্ট হয় না। অন্যের হাতের খানা খেতে হবে। শুরু হলো এক নতুন বিজনেস। রেস্টুরেন্ট বিজনেস।
রাস্তার মোড়ে, খেলার মাঠের কিনারায়, লেকের ধারে, ট্রেনের ভেতর, ভার্সিটির ভেতরে, সিঁড়ির চিপায়, সিনেমা হলের ভেতরে, হস্পিটালের ওয়েটিং রুমে গিজগিজ করে তৈরি হলো রেস্টুরেন্ট। মানুষ লেকের ধারে, খেলার মাঠে, বইমেলায়, সিনেমা হলে কাজের জন্য যায় না। দুটো বই কিনলে দশটা বইয়ের সমান তেলে ভাজা খানা খেতে হবে। পাঁচশো টাকায় সিনেমা দেখলে সাতশো টাকায় টেস্টিংসল্ট ভর্তি পপকর্ন-চিকেন খেতে হবে। আড়াইশো টাকার টিকেটে খেলে দেখলে এক হাজার টাকার নোংরা-গন্ধময় ঘুগনি মাখানো-তেলে মাখানো ঝালমুড়ি।
মানুষ এখন খেলা দেখতে, বই কিনতে, খেলতে, সিনেমায় যায় না। মানুষ যায় খেতে। বৃহস্পতিবার আগে নদীর ধারে যেতো। পানি দেখে, শীতল জলে মাখানো বাতাসে আমার শরীরের ক্লান্তি দূর হতো। এখন বৃহস্পতিবার মানে- রান্না বন্ধ। বাইরে খাবো। শুক্রবার মানে ঘুরতে যাবো না। আত্মীয়দের নিয়ে বাহারী রেডমিট খাবো।
আমার বন্ধু তার বাসায় একবার সবাইকে দাওয়াত দিয়ে শাক ভাজি, সব্জি ভর্তা আর ছোট মাছ খাইয়েছে। আমার বন্ধু এখন ছোটলোক। সমাজে মুখ দেখাতে পারছে না। ওর মুখ সুন্দর। উচ্চতাও অন্যদের চেয়ে বেশি। কেন যে মুখ দেখাতে পারছে না, ছোট লোক হলো, এর কারণ আমরা খুঁজেছি।
খানা। শুধুমাত্র খানা। খানা যদি তেলতেল, খানা যদি রেডমিট, খানা যদি ভারী না হয়, খানা জমে না। সম্মান থাকে না।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি, কাচ্চি ভাই, সুলতান্স ডাইন, বাসমতি কাচ্চি… কতসব বাহারি নাম। এখনো দিনের চেয়েও রাতে পুরান ঢাকা আলোকিত। কারণ- ভারী খাবার।
মানুষ হবার অনেক যন্ত্রণা। মানুষ ত্রুটিপূর্ণ এক জীব। তাদের জিহবা ও মুখ নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে মুশকিল কাজগুলোর একটা। বাঘও ক্ষুধা না থাকলে ঘুমায়, আক্রমণাত্মক হয় না। মানুষ খুশি হলে-যন্ত্রণা পেলে-ব্রেক আপ হলে- রেজাল্ট হলে- চান্স পেলে- খতনা হলে-বিয়ে হলে সবার আগে চিন্তা করে খানা কী হবে। কত ভারী খানা দেওয়া যাবে। কয়টা গরু-খাসি পড়বে!
একজন ডাক্তার একদিন লিখেছিলেন, এক মেয়ের বাসায় তার বয়স্ক বাবা বেড়তে আসে। বাবাকে কীভাবে খাওয়াবে তার জন্য মেয়ে চিন্তিত। বাবা আসার সাথেসাথেই মিষ্টি শরবত বানিয়ে দেয়। এরপর মাছ-গোমাংস- খাসির মাংস-তেলে ভাজা বাহারী সব আয়োজন করে। বাবাকে জবরদস্তি করে মেয়ে খাওয়াতে থাকে। মাছ তো খাইলা, মাংসটা একটু চেখে দেখো। খাসিটা একটু নাও না।
বাবা উদর ভরিয়ে খান। খেতে ভালো না লাগলেও মেয়ের হাসিমুখ দেখতে খেতে থাকেন। খানা শেষে মেয়ে মিষ্টি দই-ফিরনি খেতে দেন। উপরের সবগুলো খানা একজন চল্লিশোর্ধ মানুষের জন্য ভেবেচিন্তে খাবার কথা। কারণ সুস্বাদু খানা সেই বয়সে ধীরেধীরে বিষ হয়ে যায়। বাবা খান। মেয়ে আনন্দিত হোন। শেষে বাবার মুখে একটা মিষ্টি দিয়ে খানাপর্ব শেষ করেন।
বাবা টেবিল থেকে উঠলেই মেয়ে বলেন, বাবা একটু রেস্ট করো। ফ্যান-এসি ছেড়ে দিচ্ছি, ঘুমাও।
বাবা ঘুমান। জীবনের শেষ ঘুম। রেডমিট, তৈলাক্ত খানা, চিনিভর্তি মিষ্টান্ন এবং খাবার শেষে বিশ্রাম হলো হার্ট অ্যাটাকের বিশাল এক ফ্যাক্টর। মেয়ে বোঝে না। বাবা বোঝে না। মানুষ বোঝে না। মানুষ নিজের অজান্তে নিজের প্রিয় মানুষদের হত্যা করে। নিজেদের হত্যা করে। কত টাকা খরচা করে, কত আয়োজন করে এক ইনগ্লোরিয়াস মৃত্যুর আয়োজন। আহারে!
সুলতান’স ডাইন ঢাকা শহরের একটা চমৎকার ব্র্যান্ড। সবাইকে ছাড়িয়ে, তালগাছের মতো উঁচু এক ব্র্যান্ড। আমরা কখনোই চাইনা, শুধুমাত্র একটি ফেসবুক পোস্টের কারণে, ক্রস এক্সামিনেশন, ল্যাব টেস্ট ছাড়াই তাকে সমালোচিত করতে, পথে বসাতে। বরং আলোচনা হবার কথা ছিল- ঝাল খানার বিরুদ্ধে, তৈলাক্ত খানার বিরুদ্ধে, রেড মিটের আকণ্ঠপূর্তির বিরুদ্ধে, সুযোগ পেলেই কাচ্চিতে আয়োজন করার বিরুদ্ধে।
তিক্ত সত্য হলো- কুকুরের মাংসের চেয়েও অনিরাপদ হলো এমন খানা। দীর্ঘ ইন্টার্ভেলে এমন খানা খাওয়া যেতেই পারে কিন্তু সেটাকে ছড়ানোর দায়িত্ব আমাদের নয়। পজিটিভ হোক, নেগেটিভ হোক, কোনোভাবেই সেটাকে আলোচনায় না আনা।
ফেসবুকে একদিন আরিফ আর হোসেন বলেছিল, বন্দুকের নলটাই উলটা দিকে। পাখি কীভাবে মরবে?
দেখবেন- হাসপাতালে আসা সবচেয়ে সুন্দর মানুষ- বিত্তশালী মানুষ-ধনী মানুষ, অনেক অ্যাটেন্ডেন্স আনা মানুষগুলোর মুখ বাঁকা- হাত পা প্যারালাইজড, নাকে নল, বিছানায় শুয়ে গ্যাগিং নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। খাদ্য শুধুমাত্র বাঁচার জন্য ফুয়েল। খাদ্য কখনোই বিলাসী দ্রব্য নয়। মাত্রার এক তিল পরিমাণ অতিরিক্ত খানা মৃত্যুর টিকেট হিসেবে কাজ করে।
আজ বাহার ভাই আমাকে বললো, ‘তোরা কুত্তা খা। রাস্তায় দাবড়ায়ে দাবড়ায়ে কুত্তা ধরে বাসায় খা। সেটাও ভালো… তোরা সবকিছুতে, সব আয়োজনে কাচ্চি খাস ক্যান?’
বাহার ভাই পাগল মানুষ। যা তা বলার স্বভাব। বাহার ভাইয়ের সাথে থাকতে থাকতে আমিও পাগল হয়ে গেছি। পাগলের কথা শুনবেন না। হাসবেন।
হাসলে ক্যালরি খরচা হয়। শরীর ভালো থাকে। আয়ুষ্কাল দীর্ঘায়িত হয়। কাচ্চি হলো ইনগ্লোরিয়াস মৃত্যুর এক পরোয়ানা মাত্র।
আমি আর আমার ফ্যামিলি সব সময়
কাচ্চি ডাইন ,কাচ্চি ভাই অথবা সুলতানস ডাইন এ
সব সময় খাই কিন্তু আমার খাশি ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না ।
বাকিটা আপনাদের ইচ্ছা ।
কিছুটা কালেক্টেড
