“ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা- ২০২৩” শুরু হয় ০১ জানুয়ারি। মেলাটি আজ ৩১ জানুয়ারি শেষ হবে। সংক্ষেপে আমরা সবাই এই মেলাকে বাণিজ্য মেলা বলে থাকি। মেলাটি বাংলাদেশ,ভারত,চীন,তুর্কিসহ বিভিন্ন দেশের স্টলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বলে এটি একটি আন্তর্জাতিক মেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ঢাকার অদূরে পূর্বাচল ৪ নং সেক্টরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে মেলাটি সকাল ১০ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
আমার প্রথম মিটআপ অভিজ্ঞতা:
ছবিতে আমি (বামে-১ম) লোকাল গাইডদের সাথে।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০২৩ এ অংশগ্রহণ করার সুযোগটি আসে গতকাল ৩০ জানুয়ারি। মূলত এটি ছিল আমার প্রথম মিটআপ। এর মাধ্যমে আমি গুগল ম্যাপ লোকাল গাইডের সাথে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য মেলা ঘুরে আসতে পেরেছি। আমার প্রথম মিটআপ অভিজ্ঞতা থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করব।
যেভাবে যাবেন :
নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে কাঞ্চন ব্রীজের পথে জ্যামে আটকে আছে বিআরটিসি সিঙ্গেল ডেকার বাস
বাণিজ্য মেলায় আমি কুমিল্লা থেকে রওয়ানা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা হয়ে পূর্বাচলের কাঞ্চন ব্রীজ নেমে বাণিজ্য মেলা গেইটে পৌঁছে যাই। যারা ঢাকা থেকে আসবেন আপনারা কুড়িল বিশ্বরোড নেমে সেখান থেকে বিআরটিসি বাসে করে বাণিজ্য মেলার গেইটে চলে আসতে পারবেন। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাণিজ্য মেলার গেইট পর্যন্ত ভাড়া নিবে ৩৫ টাকা। বাসের টিকিট কাউন্টার থেকে ক্যাশের মাধ্যমে নিতে পারবেন। বাসে কুড়িল থেকে বাণিজ্য মেলা যেতে সময় লাগবে ৩০ মিনিট ।
বাণিজ্য মেলার টিকেট :
বাণিজ্য মেলার টিকেট বড়দের জন্য ৪০ টাকা ও ছোটদের জন্য ২০ টাকা
মেলায় বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট করে কিংবা ক্যাশ কাউন্টার থেকে টিকেট কিনতে পারবেন। বড়দের জন্য টিকেট ৪০ টাকা ও ছোটদের জন্য ২০ টাকা।
প্রবেশপথে যা যা দেখবেন :
বাইরে থেকে বাণিজ্য মেলার প্রবেশপথ
বাণিজ্য মেলার গেইটে পৌঁছামাত্র চোখে পড়বে প্রবেশপথ ও বাহির পথের গেইট। গেইট দুটির উপরে ২ টি মেট্রোরেলের ভাস্কর্য রয়েছে। গেইটের সামনে রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২ টি ভাস্কর্য ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাস্কর্য। এছাড়া সবার উপরে লাল অক্ষরে বড় করে লেখা রয়েছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ার ২০২৩।
প্রবেশের পর যা চোখে পড়বে :
বাণিজ্য মেলার ফোয়ারা ও ফ্ল্যাগস্টান্ড
গেইটে প্রবেশের পর শুরুতে ৬ সারিতে ৮ টি করে পতাকা ফ্লাগস্ট্যান্ডে উড়ছে। প্রথমে রয়েছে বাংলাদেশের পতাকা এবং বাকিগুলোতে বিভিন্ন রং এর পতাকা। কিছুদূর এগিয়ে গেলে দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা চোখে পড়ে। ফোয়ারাটি প্রবেশের পর মাঠের মাঝখানে অবস্থিত। মূলত মেলাটি ৩ টি অংশে বিভক্ত। প্রথমে আছে একটি খোলা মাঠ যেখানে পশ্চিম পাশে রয়েছে বসার ব্যবস্থা, বিকাশ বুথ, মাঝখানে রয়েছে ফোয়ারা, পূর্ব দিকে রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ ও স্টল। এরপর দ্বিতীয় অংশে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার। তৃতীয় অংশে মেলার বাকি সব স্টল।
মেলায় যেটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন সেটি হলো বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার। অনেক দূর থেকে ঢেউ খেলানো এক্সিবিশন সেন্টারটি হবার নজর কাড়ে।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার
বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এক্সিবিশন সেন্টারটির বিভিন্ন অংশে লোগোযুক্ত উপরে চায়না এইড ও এর নিচে ফর শেয়ারর্ড ফিউচার কথাটি লেখা রয়েছে।
আমি যেভাবে বাণিজ্য মেলাটি ঘুরেছি:
দুপুরে মেলায় প্রবেশের পর আমি মিটআপ হোস্ট ও বাকিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ৩০ মিনিটের মধ্যে সবাই চলে আসার পর কুশল বিনিময় শেষে শুরু হয় ছবি তোলা ও ভিডিও করার প্রতিযোগিতা। সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। মেলা প্রাঙ্গণটি খোলা হওয়ার কারণে রোদের তাপটা বেশি লাগছিল। তাই ভাবলাম বসে একটু জিরিয়ে নিই। তাই সবাই পশ্চিমপাশের বিকাশের বুথের সামনের সাদা প্লাস্টিক বেঞ্চগুলোতে বসে পড়লাম। এরপর রোদ থেকে বাঁচতে চলে গেলাম এক্সিবিশন সেন্টারে। প্রবেশের শুরুতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্ণার। এরপর ডান ও বাম পাশে সাড়ি সাড়ি স্টল।
কাপড়, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স,আতর, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন ধরনের স্টল এক্সিবিশন সেন্টারটিতে রয়েছে। সেন্টারটি থেকে বের হয়ে সামনে যেতেই চোখে পড়ল ফরেইন প্যাভিলিয়ন। ভারতীয় মসলা, প্রসাধনী,কাশ্মীরি আচার,কাশ্মীরি সিল্ক কার্পেট,তুর্কী কার্পেটসহ বিভিন্ন ধরনের বিদেশি স্টল।
মেলার রাইডসমূহ
এরপর আমরা চলে যাই মেলার শেষের দিকে যেখানে আরএফএলের প্যাভিলিয়নের পাশেই রয়েছে শিশুদের ও বড়দের রাইড।শিশুদের জন্য ট্রেন ও স্লাইডার রয়েছে। বড়দের জন্য নৌকা রাইড রয়েছে।
ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প :
মেলায় অসুস্থ হলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আপনাদের জন্য এক্সিবিশন সেন্টারের মেলার পূর্ব পাশে রয়েছে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প সেবা। এছাড়া রয়েছে রক্তদান কর্মসূচি। আপনি চাইলে মেডিকেল সেবা নিতে পারেন কিংবা আপনার মূল্যবান রক্ত দিয়ে মুমূর্ষু কোনো রোগীর প্রাণ বাঁচাতে পারেন।
মেলায় খাবার:
নুডুলস হাতে চপস্টিক এর সামনে
মেলায় ঘুরে ক্ষুধাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। কোথায় খাবো,কি খাবো ভাবতে ভাবতে সোজা চলে যাই খাবারের স্টলগুলোর সামনে। খাবারের স্টলগুলো মেলার শেষপ্রান্তে অবস্থিত। অরিজিনাল হাজীর বিরিয়ানি,ঢাকাইয়া হাজীর বিরিয়ানিসহ বিভিন্ন ধরণের খাবারের স্টল দেখলাম। যেহেতু আমরা স্টুডেন্ট তাই চাচ্ছিলাম কম খরচে পেট ভরে এরকম কিছু খেতে। পেয়েও গেলাম। স্কয়ারের চপস্টিক ইন্সট্যান্ট নুডুলস।দাম ৬০ টাকা। একটা বক্স করা প্যাকেটে গরম নুডুলস দেয়া হয়, সাথে থাকে একটি চামচ। খেতে ভালো লেগেছিল এবং পেট ভরেছিল। খাবার শেষে পানি তো খেতে হবে। পানির জন্য চলে গেলাম মুক্তা পানির স্টলে। ৫০০ মিলি পানির বোতল মাত্র ১০ টাকা।সব মিলিয়ে ৭০ টাকায় ভালো একটা খাবার খেয়ে ফেললাম। পেটও শান্ত হলো।
আবার শুরু ঘোরাঘুরি :
খাবার খেয়ে আবার বাণিজ্য মেলায় ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। একটি ইরানি লাইটের দোকানে ঢুকলাম। সেখানে গিয়ে দেখি হরেক রকম বাতি জ্বলছে।
নকশা করা পেয়ালা ও মাথার খুলি
আরো আছে বিভিন্ন নকশা করা পেয়ালা, মাথার খুলি,মগ,ঘোড়াসহ নানান ঘর সাজানোর উপকরণ। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পাটের স্টলগুলোতে প্রবেশ করলাম। পাটের তৈরি ব্যাগ,পাপসসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যেগুলো দেখে ভালোই লাগছিল। যতই দেখি ততই ভালো লাগে। কি নেই বানিজ্য মেলায়। বিছানার চাদর থেকে শুরু করে একটি সংসারে যা যা লাগে সব পাওয়া যায় এখানে।
সন্ধায় লোকাল গাইডের একজন সদস্য মিল্ক ভিটার লাবাং খাওয়নোর জন্য নিয়ে গেল। ৩০ টাকা প্রতি বোতল লাবাং,খেতে মন্দ লাগছিল না।
বাণিজ্য মেলা দেখা শেষে বের হওয়ার সময় একটি গেমস নজর কাড়ে। একটি ছোট ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে গোলপোস্ট। এর মধ্যে দিয়ে বল নিতে পারলে গোল।
মেলা থেকে বাড়ি ফেরা :
বিকাশ পেমেন্টে কেনা বাসের টিকেট
রাত ৮ টা পর্যন্ত বাণিজ্য মেলায় ঘোরার পর এবার বাড়ি ফেরার পালা। বাহির গেইট দিয়ে বের হয়ে বাসের টিকিটের জন্য চলে গেলাম বিকাশ টিকেট বুথে। সেখানে কুড়িল বিশ্বরোডের ৩৫ টাকা ভাড়া দিয়ে টিকেট কিনলাম। এরপর লম্বা লাইন ধরে বাসে উঠে নিরাপদে বাড়ি ফিরলাম।
সকলের প্রতি অনুরোধ :
বাণিজ্য মেলাকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের ভিড় যেমন বেড়েছে,তেমনি বেড়েছে পরিবেশ নোংরা করার হার। বাণিজ্য মেলায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন থাকলেও অনেকেই যেখানে সেখানে ময়লা, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছে। তাই আসুন আমরা সবাই যথাস্থানে ময়লা ফেলি এবং বাংলাদেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সহযোগিতা করি।










