সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্লাষ্টিক দূষণ রোধে বিদ্যানন্দের উদ্যোগ ও সচেতনতা

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। ২.১৩৪ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত বেষ্ঠিত এ দ্বিপে প্রায় ৮হাজার মানুষ স্থায়ী ভাবে বসবাস করে। এরা অধিকাংশই পেশায় জেলে। প্রাকৃতিক নৈস্বর্গ মন্ডিত সেন্টমার্টিন দ্বীপে ১৫৪ প্রজাতির শৈবাল,১৫৭ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৫৭-১৯১ প্রজাতির শামুক, ২৪০ প্রজাতির মাছ, ১২০ প্রজাতির পাখি, ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণি ও ২৯ প্রজাতির শাপ রয়েছে।

( সেন্টমার্টিন দ্বীপে সূর্যাস্ত )

কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে ১০ টি শিপ সেন্টমার্টিন দ্বিপে যাকায়াত করে। অক্টোবর থেকে থেকে মার্চ মাস জাহাজ চলাচলের অনুমতি থাকে। এসময়ে প্রতিদিন প্রায় ৭হাজার-৮হাজার দর্শনার্থী সেন্টমার্টিনে আসে। সে হিসেবে প্রায় ১৩লক্ষ মানুষ প্রতি বছর ভ্রমণের জন্য সেন্ট মার্টিন আসে।
৬মাসে ১৩ লক্ষ মানুষ যেখানে ঘুরতে আসে সেখানে কি পরিমান ময়লা তৈরি হয়? যার অধিকাংশই প্লাষ্টিক বা অপচনশীল ময়লা। সেন্টমার্টিন জেটি, সমুদ্র সৈকত ও সৈকতের পাশের রাস্তায় সব সময়ই প্লাষ্টিক ও অপচনশীল ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ এই দ্বীপে নেই প্লাষ্টিক রিসাইকেলের ব্যবস্তা বা নিকটবর্তী টেকনাফে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা।

( সমুদ্র সৈকতে প্লাস্টিক বোতলের দূষণের ব্যানার )

সম্প্রতি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের একটি অভিনব উদ্যোগ চোখে পড়ল। তারা সেন্টমার্টিন দ্বীপে একটি স্থায়ি দোকান খুলেছে। যেখানে নির্দিষ্ট পরিমান প্লাস্টিকের বিনিময়ে বাজার করা যায়। স্থানীয় নিম্নআয়ের মানুষ সৈকত ও বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে প্লাস্টিকের বোতল, মিনারেল পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, বিভিন্ন খাবারের প্লাষ্টিকের মোডক জমিয়ে তা বিদ্যানন্দের দোকানে জমা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার নিয়ে যাচ্ছে। কি অসাধারন আইডিয়া! বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন অভিনব উদ্যোগ নেয়ার জন্য।

(বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্লাস্টিকের বিনিময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যের দোকান )

করোনা মহামারির সময় আমরা তাদের অসাধারন কাজ দেখেছি। তারা চট্টগ্রামে করোনা হসপিটাল খুলেছিল, “১টাকায় আহার” প্রজেক্ট চলছে, বান্দরবানের গহিন পাহাড়ে স্কুল চালাচ্ছে আরো অনেককিছু তাদের প্রজেক্টে আছে। সবকিছুর জন্য তাদের আবারো ধন্যবাদ।

(বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্লাস্টিক জমা দিয়ে বাজার করার ক্যাম্পেইন )

আমরা শহরের মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৫০০গ্রাম প্লাষ্টিক ময়লা তৈরি করি আর দ্বীপের মানুষ প্রতিদিন ২৫০ গ্রাম প্লাষ্টিক ময়লা তৈরি করে থাকে। এই প্লাস্টিক ও অপচনশীল ময়লা কেন আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তার কিছু তথ্য দেই-

  • কাগজ জাতীয় ময়লা মাটিতে মিশতে সময় নেয় ২ থেকে ৬ সপ্তাহ।
  • সুতি কাপড় মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৬মাস থেকে ১ বছর।
  • লিকরা ও পলেষ্টার কাপড় মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৫০০+ বছর।
  • চামড়াজাত পণ্য মাটিতে মিশতে সময় নেয় ২৫ - ৪০ বছর।
  • প্লাষ্টিক ও প্লাষ্টিকজাত পন্য প্রকারভেদে মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৪০০ - ৬০০ বছর।
  • লোহা মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৫০ - ৫০০ বছর।
  • মাছ ধরার জাল মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৬০০ বছর।
  • গ্লাস মাটিতে মিশতে সময় নেয় ৪০০০ বছর!
  • ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস বা যন্ত্রাংশ ১০০০+ বছর বা পুরোপুরি অপচনশীল।

বাংলাদেশে প্রতিদিন ১৭০০ টন প্লাষ্টিকজাত ময়লা তৈরি হয়। শুধুমাত্র ঢাকা শহরে প্লাষ্টিকজাত ময়লা তৈরি হয় ৬৪৫ টন যার মাত্র ৩৭.২% রিসাইকেল করা হয়। দেশের বাকি প্লাষ্টিকজাত ময়লার আনুমানিক ৮০% রিসাইকেল প্রসেসের বাইরে থেকে যায়। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীর প্রবাহে বছরে ৭৩০০০ টন প্লাষ্টিক ফেলা হয় যা সাধারণভাবে সাগরে এসে মিলে। সরকার প্রতিবছর $৫৭০ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনতে হয় জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যের বিরুদ্ধে কাজ করতে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% প্লাষ্টিকজাত পন্যের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। আমাদের সকলের উচিত এই উদ্যাগের সাথে কাজ করা।

প্লাষ্টিক দূষনের ফলে আমাদের ক্ষতিকর দিক কি?

  • প্লাষ্টিক দূষণ বাসস্থান ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে।
  • বাস্তুতন্ত্র হ্রাস করে।
  • জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব ফেলে।
  • লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
  • জনস্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
  • মাটির নিচের পানি দূষণ করে।
  • পরিবেশ দূষন করে।
  • বায়ু দূষণ করে।
  • জীব-জন্তুর নিধনে প্রভাব ফেলে।
    এবার সিদ্ধান্ত আপনার! আপনি পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হবে নাকি প্লাষ্টিক দূষনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। প্লাস্টিক ও অপচনশীল ময়লার দূষণ প্রতিরোধে আপনি, আমি কি করতে পারি?
  • সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য হচ্ছে “পলিথিন ব্যাগ”। আমরা বাজারে কেনাকাটার সময় পলিথিন ব্যাগ পরিহার করি। বহুবার ব্যবহার যোগ্য কাপড়ের ব্যাগ সাথে নিয়ে বাজারে যাবো। ১০০-১৫০ গ্রাম ওজনের মোবাইল সারাক্ষণ পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারলে, ২৫ গ্রাম ওজনের বহুবার ব্যবহার যোগ্য বাজারের ব্যাগ কেনো সাথে নিতে পারবোনা!
  • প্লাষ্টিক বোতলের মিনারেল পানি ও সফট ড্রিংকস পরিহার করতে হবে। বাড়ি থেকে বের হবার সময় বহুবার ব্যবহার যোগ্য বোতলে পানি নিয়ে বের হবো।
  • প্লাষ্টিক মোড়কজাত খাবার সামগ্রী না কেনা।
  • আপনার যাবতীয় সকল জিনিস রিসাইকেল করা বা Non-Plastic পণ্য কেনা।
  • ডিসপোসএবল প্লাস্টিক ব্যবহার না করা।
  • সম্ভব হলে আপনার শহরের ব্যবসায়ীদের সচেতন করা, তারা কিভাবে তাদের পন্য প্লাষ্টিক ব্যবহার ছাড়া বাকারজাত করতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা করা।
  • আপনার অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনের বাইরে কেনা কাটা না করা।
  • সর্বশেষ নিজেকে সচেতন করা। আমি প্লাষ্টিক পণ্য ব্যবহার করবো না বা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনবো এই সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে হবে।

#bdlgwritingcontest #bdlg200 #200meetup
#OceanConservency #PlasticPollution #Bangladesh

13 Likes

@MdFerozKabir সুন্দর একটি পোষ্টের জন্য ধন্যবাদ

1 Like