হাতি মুড়া পাড়ায়, মায়ুং কপালের চূড়ায়...

সুপ্রিয় লোকাল গাইডস বন্ধুগণ,

আশা করছি, আপনারা সবাই নিজ নিজ অবস্থানে ভাল আছেন এবং সুস্থভাবে জীবনযাপন করছেন।

আজকে আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি জেলার পেরাছরা ইউনিয়নের মায়ুং কপাল গ্রামের “স্বর্গের সিঁড়ি (হাতি মুড়া)” নামক স্থান সম্পর্কে।

একটি সুউচ্চ পাহাড়ের অনেকটা নিচ থেকে উপর পর্যন্ত ধাপে ধাপে খুব সুন্দর করে সিঁড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাহাড়টি দেখতে অনেকটা হাতির মাথার অবয়ব এর মত হওয়ায় স্থানীয়দের অনেকে এটিকে “হাতি মুড়া” বলে ডাকে। চাকমাদের ভাষায় এই জায়গাটির নাম “এ্যাডো শিরা মোন” আর ত্রিপুরাদের ভাষায় এই জায়গাটির নাম “মায়ুং কপাল”। “এ্যাডো শিরা মোন” ও “মায়ুং কপাল” উভয়ের অর্থই হাতির মাথা। তবে বর্তমানে এটি স্থানীয়দের কাছে “মায়ুং কপাল”, আর ভ্রমণ পিপাসুদের নিকট “স্বর্গের সিঁড়ি” হিসেবে বেশি পরিচিত।

এই স্বর্গের সিঁড়ির অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি জেলার উপজেলা সদরের পেরাছরা ইউনিয়নের “মায়ুং কপাল বা হাতি মুড়া” গ্রামে। স্বর্গের সিঁড়িটি চিত্র-বৈচিত্রে ঘেরা ২৬৯৯.৫৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের খাগড়াছড়ি জেলার অনিন্দ্য সুন্দর মন জুড়ানো একটি ভ্রমণ কেন্দ্র।

আমি বলব কারো যদি কখনো মন খারাপ হয় তাহলে চট করে ঘুরে আসতে পারেন স্বর্গের সিঁড়ি নামক এই জায়গাটি থেকে। তবে মনে রাখবেন এখানে যেতে হলে আপনাকে ট্র্যাকিং করেই যেতে হবে। তাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি, স্যালাইন, গামছা ইত্যাদি) সাথে নিয়ে নিবেন। প্রায় দেড় ঘন্টা পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তা বেয়ে ছোট-বড় পাহাড় ডিঙ্গিয়ে সিঁড়ির গোঁড়ায় গিয়ে পৌঁছলেই মনটা ভালো হয়ে যাবে। আর সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার পর চোখ মেলে যখন দেখবেন সমুদ্রের ঢেউ এর মত সবুজে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়ের ঢেউ।

সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার পর পাহাড় থেকে দেখা যাবে খাগড়াছড়ি জেলার বিশাল একটা অংশ যার উত্তরে রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা ও পূর্বে রয়েছে ভারতের মিজোরাম।। যেদিকেই তাকাইনা কেন, যতদূর চোখ যায় দিগন্ত জোড়া খোলা আকাশের নিচে দেখা যাবে শুধু সবুজ আর সবুজের সমারোহ।

এবার আসি কিভাবে এর নাম স্বর্গের সিঁড়ি হল…? প্রকৃতপক্ষে এর নামের বিষয়ে স্পষ্ট কোন ধারণা না পাওয়া গেলেও লোকমুখে শোনা যায় যে, শতাধিক সিঁড়ি সম্বলিত এর অপরূপ সৌন্দর্য্যের কারণেই অনেকেই একে স্বর্গের সিঁড়ি বলে সম্বোধন করা শুরু করে। আর ধীরে ধীরে একসময় এটি স্বর্গের সিঁড়ি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। তবে একটা কথা বলে রাখি দুনিয়ায় কোন কিছুই কিন্তু স্বর্গ বা বেহেশত এর সাথে তুলনীয় নয়।

এই স্বর্গের সিঁড়ি কতটি ধাপ বা সিঁড়ির সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছে, তারও কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৯ সালের ১৪ই নভেম্বর আমি সহ আরো কয়েকজন (রণি, রাজন, নূর মোহাম্মদ, মুবিন ভাই, নোমান ও নূর ভাই এর ভাগিনা আকিব) মিলে গিয়েছিলাম এই স্বর্গের সিঁড়ির অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য। আমি তখন নিজের জানার আগ্রহ বসত সিঁড়ির কয়টি ধাপ আছে তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিঁড়ির ধাপ গণনা শুরু করি। গণনা করে যেই তথ্যটি নিশ্চিত হলাম সেটি হল- এখানে ছোট বড় সবগুলো ধাপ মিলিয়ে ২৭৫ টি ধাপ অক্ষত অবস্থায় আছে। ছোট ধাপ পেয়েছিলাম ২৬৯ টি আর বড় ধাপ পেয়েছিলাম ৬ টি। পূর্বে হয়ত আরো কয়েকটি ধাপ বেশি ছিল যা মাটির নিচে চাপা পরে গেছে অথবা ব্যবহারের ফলে ঐ ধাপগুলোর ক্ষয় সাধন হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী স্থানীয় পাহাড়ি ক্ষুদ্র-জনগোষ্ঠীর একজনের সাথে আলোচনা করে জানা যায় যে, এই স্বর্গের সিঁড়িটি ২৯৪ টি ধাপ বা সিঁড়ির সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল। স্থানীয়দের কাছ থেকে আরো জানা যায়, নান্দনিক এই সিঁড়িটি নির্মিত হওয়ার আগে পাহাড়ি এলাকার এসব বাসিন্দারা গাছের গুরি ফেলে সেগুলোর উপর দিয়ে আসা-যাওয়া করত। বর্ষাকালে এসব পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তায় চলাচল করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

মূলত পাহাড়ি গ্রাম মায়ুং কপালে যাওয়ার জন্য ২০১৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বোর্ড উন্নয়নের আওতায় ক্ষুদ্র-জাতিগোষ্ঠীর চলাচলের সুবিধার্থে আনুমানিক ১২০-১১০ ডিগ্রী এ্যাঙ্গেলের এই সিঁড়িটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩০৮ ফুট লম্বা লোহার এই সিঁড়িটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছিল ১৫ লক্ষ টাকার মত। এই স্বর্গের সিঁড়ির শুভ উদ্বোধন করেন তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব পার্বত্য চট্টগ্রাম বোর্ড উন্নয়ন এর চেয়ারম্যান জনাব নব বিক্রম ত্রিপুরা। এর উদ্বোধন করা হয় ২০১৫ সালের ১৩ জুন (বাংলা ৩০ জৈষ্ঠ্য ১৪২২ সন)। পাহাড়ি ক্ষুদ্র-জাতিগোষ্ঠীর মায়ুং কপাল, ভাঙামুড়া, বাদলছড়া সহ প্রায় ১৫ টি গ্রামের মানুষ দূর্গম এই পথ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করে থাকে। পুরো খাগড়াছড়ি জুড়ে ২.৭৫ লক্ষ খুদে – জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ ভাগ জনসংখ্যা চাকমা জাতিগোষ্ঠীর হলেও এই অংশে মূলত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি। এছাড়াও রয়েছে মারমা ও তাঞ্চঙ্গ্যা জাতিগোষ্ঠীর লোক। এসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা সাধারণত অকৃত্রিম প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকলেও এদের সবাই মূলত কৃষিজীবী। এসব কৃষি কাজের বেশিরভাগই হচ্ছে জুমচাষ। মায়ুং কপাল তথা স্বর্গের সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে চোখে পড়বে স্থানীয় পাহাড়িদের জুমচাষের সেই অপরূপ দৃশ্যসমূহ। পথে পথে যেতে যেতে আরো চোখে পড়বে সেগুন, গামারি, বাঁশ ও কলাগাছের ছায়ায় সমারোহ অনাবিল সৌন্দর্য। এসব পাহাড়ি পল্লীতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র-জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব লোকসাহিত্য, ঐতিহ্যময় নাচ-গান, রীতিনীতি, পোশাক, অলংকার, খাবার – দাবার ও ধর্ম-বিশ্বাস। যেমন – চাকমারা পালন করে বিবসু উৎসব, মারমারা পালন করে সাংগ্রাই উৎসব আর ত্রিপুরারা পালন করে বৈসাবী উৎসব।

২০১৫ সালের পর থেকেই ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে স্বর্গের সিঁড়ি দেশের অন্যতম একটি আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়, যা ধীরে ধীরে সকলের নিকট জনপ্রিয় হতে থাকে।

স্বর্গের সিঁড়ি তথা মায়ুং কপালে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই খেয়াল রাখব যে, আমাদের কোন কাজের দ্বারা যাতে এসব ক্ষুদ্র – জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে কোন আঘাত না লাগে। আমরা তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করব।

পোস্টটি পড়ার জন্য সবাইকে অনেক ধন্যবাদ । কানেক্ট এ এটাই আমার প্রথম পোস্ট। আশা করছি, আমার এই লেখাটি সবার কাছে ভালো লাগবে । আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম ।

#Travel

#LetsGuide

#LocalGuides

#LocalGuidesConnect

26 Likes

Hi @AmzadHossain

Really it’s a so nice post !! As you are new here and this is your first post ,absolutely it is a great post! You can nicely describe one of our famous and beautiful place " Mayung Kopal ot Hati Mura para" at Khagrachari in Chittagong Hill Track, I also visited many places at Khagrachari but still didn’t visit at Mayung Kopal, next time I will definitely visit there, you make me crazy to go there

Pls keep it up your writing here in Connect and present us more nice stories

Have a nice day :pray: :handshake:

5 Likes

@AmzadHossain

Really, it’s a beautiful place! thanks for your informative post.

2 Likes

@AmzadHossain , thank you. It is your first post in LG connect but you have written an excellent post. Added photos are also very nice. Hope for more interesting posts here.

2 Likes

@AmzadHossain অনেক সুন্দর এবং বিস্তারিত লেখেছেন। আমার এখনো যাওয়া হয়নি তাই লেখাটা এবং ছবি গুলো উপভোগ করছি। ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা পোস্ট শেয়ার করার জন্য।

আরো পোস্ট এবং কানেক্ট নিয়মিত চাই আপনাকে ভাই।

হ্যাপী গাইডিং !

2 Likes

আসসালামু আলাইকুম @AmzadHossain ভাই

আমি আপনার এই সুন্দর ভ্রমন কাহিনী পড়ে অনেক ভাল লাগল। অনেক কিছু জানতে পারলাম। এটি যে খাগড়াছড়িতে আছে আমার জানা ছিল না। আপনার এই পোস্টটির মাধ্যমে জানতে পারলাম।

আপনি যে অনেক কৌতুহলী ও ভ্রমণপিপাসু তা বুঝতে পারলাম। সিঁড়িগুলো ধৈর্যের সহিত আপনি গণণা করেছেন! আমি মনে করি এটি একটি অনেক বড় কাজ। আমাদের আসলে সর্বদাই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অবহেলা বা তাদের কোন ক্ষতি করা উচিত নয়।

সর্বপরি, আপনার পোস্টটির লেখা দারুণ লেগেছে আমার কাছে। অনেক ভাল ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন। আরো লিখবেন বলে আশা করি।

1 Like

Very detailed post with nice picture. Thanks @AmzadHossain for share with us. Hope you will share more travel story with us.

1 Like

Nice post. Thanks for shairing with us. @AmzadHossain

1 Like

Great story you shared @AmzadHossain this must have been a wonderful trip.

1 Like

Yes, that was a very wonderful trip and thank you so much for reading this.

জায়গাটির আসল নাম মায়ুং কপাল। পর্যটকদের কাছে পরিচিত হওয়ার আগে থেকে এই জায়গার নাম ছিল মায়ুং কপাল। আশা করছি আপনারা সেই আসল নাম দিয়ে প্রমোট করবেন