সড়কপথে কলকাতা ভ্রমণ ও তার আদীপান্ত

শুভেচ্ছা নিবেন, আশা করছি ভালই আছেন। আজকে আমি আপনাদের নিয়ে যাব ঢাকা থেকে কলকাতা বাসে যাওয়া, এই ভ্রমণে এখনকার অসুবিধা কি সুবিধা কি এসব তথ্য দেয়ার চেষ্টা করব।

ঢাকা থেকে বেনাপোল যাত্রা:
রাত সাড়ে দশটা আরামবাগ কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্যামলী এন আর বাস, রাত পৌনে এগারোটায় বাসটি কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। বাসটি শ্যামলী এন আর পরিবহনের হলেও এটি মূলত রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা বিআরটিসি’র বাস সার্ভিস, টেন্ডারের মাধ্যমে এটি বিআরটিসি হয়ে যাত্রী পরিবহনের কাজ পেয়েছে শ্যামলী এন আর আজ আমি এই বাসের যাত্রী। বিশ্ববিখ্যাত হ্যুন্দাই কোম্পানির বিলাসবহুল উঠে মনে হল যাত্রাটি ভালোই হবে যাত্রী ও ছিল বেশ, রাত পৌনে এগারোটায় বাস চলতে শুরু করল কলকাতার উদ্দেশ্যে, চলতে থাকল গাড়ি ব্যস্ত রাজধানী আলোকিত রাজপথে।
এই ফাঁকে জানিয়ে দেই ভাড়ার বিষয়:
এই গাড়িতে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে চাইলে মোট ভাড়া গুনতে হবে 1950 টাকা। এছাড়া 500 টাকার ট্রাভেল ট্যাক্স দিতে হবে সেটাও বেনাপোল বন্দরে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশন ফেস করার আগে।
অন্যান্য বাস সার্ভিস সমূহ:
শ্যামলী এন আর ছাড়াও গ্রীন লাইন, সোহাগ, দেশ ট্রাভেলস ও লন্ডন এক্সপ্রেস সহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি বাস ঢাকা-কলকাতা প্রতিনিয়ত চলাচল করে, বাসগুলোর ভাড়া ও কাছাকাছি।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট:
সব ঠিক থাকলে রাত দেড়টার দিকে মানিকগঞ্জের অন্তর্গত পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছে যাবেন। এখানে অনেক ক্ষেত্রে অনেক সময় লেগে যায়, তবে আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা ব্যতিক্রম ছিল 5 মিনিটের মধ্যেই আমরা সেটি পেয়ে যাওয়াতে ফেরিতে উঠে যায়। এবং আমাদের যাত্রা শুরু হয় দৌলোদিয়া বা গোয়ালন্দের দিকে। ফেরিতে ওঠার পর আপনি চাইলে খাওয়া-দাওয়াসহ টয়লেট সেরে নিতে পারবেন কারণেই এই ভ্রমণটা আপনার 50 থেকে 60 মিনিট এর হয়ে থাকে। সেই সাথে গাড়িতে বসে না থেকে রাতের পদ্মার অপূর্ব দৃশ্য দেখে নিতে পারেন মন ভরে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে দিন-রাত 24 ঘণ্টায় ব্যস্ত থাকে ফেরি চলাচলে প্রতিদিন বহুৎ যানবাহন পারাপার হয় এই রুটের সাহায্যে, রাতের পদ্মায় ফেরি চলাচলের দৃশ্য দারুন। প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যেই ফেরিটি দৌলোদিয়া পৌঁছে গেল। ফেরি থেকে রাস্তায় উঠে আবার যাত্রা শুরু করলো। ফেরিঘাটে সময় না লাগলে আপনি আট ঘণ্টার মধ্যে বেনাপোল পৌঁছাতে পারবেন।
বেনাপোল-পেট্রোপোল বন্দর:
সকালে যখন ঘুম ভাংলো উঠে দেখি বেনাপোল পৌঁছে গেছি, বন্দরের কর্মতৎপরতা তখনও শুরু হয়নি। আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এর সামনে লোকজনের সমাগম হতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে, যারা ভারত ভ্রমণে ইচ্ছুক।
ট্রাভেল ট্যাক্স:
ট্রাভেল ট্যাক্স দেয়ার জন্য আপনি চাইলে নিজেও দিতে পারেন অথবা বাসের সুপারভাইজার কে 500 টাকা অতিরিক্ত 50 অথবা 100 টাকা বকশিশ বাবদ দিয়ে ট্যাক্স দিতে পারবেন।
• তবে আমি রিকমেন্ড করব আপনি যেহেতু ভ্রমণের যাত্রা কনফার্ম করেছেন পার্শ্ববর্তী কোন সোনালী ব্যাংক থেকে নিজে গিয়ে ট্রাভেল ট্যাক্স জমা দিয়ে আসবেন এতে আপনার সময় এবং ভোগান্তি দুইটাই কম হবে।
আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ফি:
বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিটি প্যাসেঞ্জার কে 43 টাকা 50 পয়সা করে দিতে হবে, তবে সেখানে আপনাকে 50 টাকা দিলে আর বাকি টাকা ফেরত দেয়া হয় না।
বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন:
প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ফি পরিশোধের পরে আপনাকে ভিতরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হবে, তখন আপনাকে ট্রাভেল ট্যাক্স এর কপি গুলোতে সিল দেয়া হবে এবং তিনটির মধ্যে একটি রেখে নেয়া হবে, সেই সাথে ইমিগ্রেশন ফরম ফিলাপ করবেন, তারপর লাইন ধরে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত যাবেন, ইমিগ্রেশন অফিসার আপনার একটি ছবি নিয়ে পাসপোর্টে সিল দিয়ে দিবে, তখন আপনি আবার প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এরিয়া থেকে বের হয়ে আপনার হাতে থাকা দুইটি ট্রাভেল ট্যাক্স এর একটি পুলিশ অফিসার কে ইন্ডিয়া বর্ডারের ঢুকার আগে দিতে হবে। তবে বলে রাখি বর্ডার থেকে বের হওয়ার সময় আপনাকে অতিরিক্ত 200 টাকা গুনতে হবে যেটা কোন নিয়ম নীতির মধ্যে নাই কিন্তু দেয়াটা বাধ্যতামূলক। আর আপনি যদি কোন দালাল ধরেন তাহলে তো কথাই থাকে না সেটা নিশ্চিত 500 থেকে 1000 টাকার মধ্যে থাকবে।
পেট্রোপোল বর্ডার:
বাংলাদেশ বর্ডারে আপনার খুব বেশি সমস্যা না হলেও, একটুপর বর্ডারে ঢুকতেই আপনি ভোগান্তির সম্মুখীন হবেন সেটি আবার ভয়ঙ্কর রকমের। ভোগান্তি টা শুরু হবে লাইন ধরে অপেক্ষা করাকে কেন্দ্র করে, আপনি চক্রাকার আকারে ঘুরতে থাকবেন, এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে সবাই বেনাপোল বর্ডার দিয়ে ঢুকতে চাই যে কারণে চাপটা খুব বেশি থাকে এজন্য ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন এটা সামলাতে হিমশিম খায়। সচরাচর সকাল ছয়টার পর পরই শুরু হয়ে যায় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া। প্রথমে আপনাকে ইন্ডিয়ান কাস্টমস আপনার পাসপোর্ট চেক করবে এবং এন্ডোস দেখবে, আপনি যদি ভিসা নেয়ার সময় ডলার দিয়ে এন্ডোস করে থাকেন তাহলে অবশ্যই ফিজিক্যালি ওই সমমান ডলার কিনে নিয়ে যাবেন। তানাহলে এটার জন্য আপনাকে প্রচুর ভোগান্তি পোহাতে হবে, সেটাও টাকা দিয়ে সমাধান করতে হবে। তারপর আপনার পাসপোর্টটি এন্ট্রি হবে, তারপর আপনি ইমিগ্রেশন করতে পারবেন, ইমিগ্রেশন শেষ করে এখন আপনি বের হবেন পেট্রোপোল এলাকায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে আপনাকে এখানেও অতিরিক্ত 200 টাকা প্রদান করতে হবে ঘুষ বাবদ ইমিগ্রেশন অফিসাররাই আপনার থেকে নিবে, এখানে এটাও যেন বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছে।
মানি এক্সচেঞ্জ:
সেখানে টাকাগুলো রুপি করে নিতে পারেন অসংখ্য মানি এক্সচেঞ্জ পাবেন সেখানে, আপনি আপনার পছন্দমত যেকোন মানি এক্সচেঞ্জার দিয়ে টাকা পরিবর্তন করে নিতে পারেন ইন্ডিয়ান রুপিতে, সেখানে রেট মোটামুটি ভালই দেয়।
সিম কার্ড:
আপনি চাইলে ভারতীয় মোবাইল সিম পেট্রাপোলে কিনে নিতে পারবেন আড়াইশো থেকে 500 টাকার মধ্যেই আপনি সিম কার্ডটি পেয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ গাড়ি ছাড়ার আগ পর্যন্ত পেট্রাপোল বন্দরে বাংলাদেশী মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় আপনি চাইলে আপনার স্বজনদের সাথে সেখান থেকেই কথা বলে নিতে পারেন বাংলাদেশি সিমে।
পেট্রোপোল থেকে কলকাতা:
সকাল 10 টা 15 মিনিটে পেট্রাপোল বন্দর থেকে আবারো যাত্রা শুরু করলো আমাদের গাড়িটি, আমি যতবারই এই পথ দিয়ে যাই ততোবারই সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে। যশোর ও পেট্রোল এপার ওপার বিশাল কার গাছের জন্য দারুন লাগে। সকাল সাড়ে 11 টার দিকে নাস্তা করার জন্য একটি স্থানে দিকে গাড়ি থামলো হোটেলের নাম গিয়ানি ধাবা। এখানকার হাইওয়ে রেস্টুরেন্টকে ধাবা বলা হয়, সকালে নাস্তা করার জন্য পাবেন 20 থেকে 25 মিনিট সময়। গাড়ি থেকে নামে আপনি চাইলে ডালভাত সবজি মাছ খেলে খরচ পড়বে 50 টাকা রুপি যা আমাদের দেশে কখনোই কল্পনা করা যায় না।
প্রায়ই 11:30 এ বাসটি আবার যাত্রা শুরু করলো নদীয়া জেলার আনন্দপুর, মহাদেবপুর পার হলো খুব দ্রুত। এসি বাসের অনেক সুবিধা আছে কিছু অসুবিধাও আছে জানালাগুলো কালকে ক্লাসে আবদ্ধ থাকায় ইচ্ছে করলেই বাইরে জিনিসগুলো আমরা স্বচ্ছ ভাবে দেখতে পারিনা। চলতে চলতে কলকাতার শহরতলি বারাসাতে যাত্রী নামতে শুরু করে, বারাসাত ছেড়ে আসা কিছু পরে দৃশ্যমান হতে থাকবে শহরমুখী কলকাতা। কলকাতা শহর টা দারুন এত মানুষ, এত গাড়ি, কোন যানজট নেই ট্রাফিক সিস্টেম টা খুব ভালো। যানবাহনগুলো নিয়ম মেনে চলা করে। ঢাকা কলকাতা কত কাছের শহর এরপরও কতো ফারাক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়। দুপুর দেড়টার দিকে বাড়ি পৌঁছে গেল গন্তব্যে একেবারে কলকাতার মারকুইস রোডে। সর্বসাকুল্যে সময় লাগলো প্রায় 14 থেকে 15 ঘণ্টা। এই মারকুইস রোডে সবগুলো বাসের কাউন্টার আপনি চাইলে এখান থেকে ফেরার টিকিটটা সাথে সাথেই করে নিতে পারেন। এরপর উঠে যেতে পারেন যে কোন একটি হোটেলে, এই হোটেলের হোটেলের ছড়াছড়ি 500 থেকে 2000 টাকার মধ্যে যেকোন হোটেল পাবেন এখানে আর সব হোটেলের অধিকাংশ বর্ডার বাংলাদেশি। বাসের এই যাত্রা টি আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে আপনি চাইলে বাসযোগে চলে আসতে পারেন সরাসরি কলকাতা।

যা করা যাবে না:
• কোনভাবেই ইন্ডিয়ান রুপি নিয়ে ইন্ডিয়ান বর্ডারে ঢুকা যাবে না।
• ডলার এন্ডোর্সমেন্ট করে যদি ভিসা নিয়ে থাকেন থাকলে তাহলে, ডলার ছাড়া ইন্ডিয়ান বর্ডার ঢোকা যাবে না, কারণ ডলার ফিজিক্যালি দেখবে।
• আপনি চাইলেও বাংলাদেশ অথবা ইন্ডিয়া যেকোনো বর্ডারে ইমিগ্রেশন ফরম ফিলাপ করতে পারবেন না যার জন্য দুইটি বর্ডার এ একশ একশ করে 200 টাকা দিতে হবে।
• কাস্টমস চেকিং এর সময় সবকিছু বৈধ থাকলেও আপনি তাদের ভাষায় অবৈধ, দুই দিকেই একশ একশ করে অতিরিক্ত 200 টাকা দিতে হবে তাহলে আপনি হবেন বৈধ।
• চেষ্টা করবেন বাংলাদেশের যখন কোন সরকারি ছুটি থাকে বা কোন রকমের অকেশনালি ছুটি থাকে তাহলে ভ্রমণ না করার জন্য ভোগান্তি এবং কষ্টের পরিমাণটা অনেক বেশি থাকে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: যা করা যাবে না, এই অংশে আমি যা লিখেছি আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, এবং নিজেই একজন ভোগান্তিময় ভিকটিম হয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। অন্যের ক্ষেত্রে এমনটা নাও হতে পারে, তবে সবাই বিষয়টা কে খুব সুন্দর ভাবে নিবেন বলে আমি আশা করছি। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢোকার টোটাল 27 টি পোর্ট সহ বেশ কিছু কমিউনিকেশন দিয়ে বর্ডারে ঢোকা যায়, গতবার আমি লিখেছিলাম ঢাকা থেকে কলকাতা ট্রেনে যাত্রা সম্পর্কে, আজ লিখলাম বাস সম্পর্কে, ভবিষ্যতে অন্য কোন টপিক নিয়ে লিখব। ধন্যবাদ সবাইকে আমার পোস্টটি পড়ার জন্য।

আগামী পর্বে আমি লিখব তাদের জন্য, যাদের বাজেট কম অথবা কম খরচে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে চান, শুধুমাত্র 560 টাকা দিয়ে কিভাবে কলকাতা যেতে পারবেন।

32 Likes

Informational post for local guides those who newly wants to Kolkata. @Sagir_Ahmmed thanks for sharing this post.

3 Likes

Demais ! Obrigado por compartilhar. :footprints: :earth_africa:

@Sagir_Ahmmed আপনাকে অনেক ধন্যবাদ একটা গুরুত্বপূর্ণ পোোস্ট দেওয়ার জন্য। ভারত সফরকারীদের জন্য ভালো হলো ।

4 Likes

@Sagir_Ahmmed অসাধারন বর্ননা . সত্যি এবং বাস্তব কথা গুলো বলেছেন ধন্যবাদ

@Sagir_Ahmmed ভাই, “বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিটি প্যাসেঞ্জার কে 43 টাকা 50 পয়সা করে দিতে হবে, তবে সেখানে আপনাকে 50 টাকা দিলে আর বাকি টাকা ফেরত দেয়া হয় না।” এই কথাটা খুব ভাল লেগেছে। এইরকম আরও তথ্যবহুল পোষ্ট আমাদের উপকারে আসবে। অসংখ্য ধন্যবাদ।

4 Likes

@Sagir_Ahmmed

Thank you for sharing your experiences travelling by road to Kolkata.

It is really an amazing experience for you.

@Sagir_Ahmmed

It’s Fort William if not wrong, but you are very good at writing, thanks.

Hi, @Sagir_Ahmmed . Wooww, :hushed: :open_mouth: very troublesome trip! The trip you told as like Pontianak(Indonesia) to Bandar Seri Begawan(Brunei) or back. That use bus transportation too and twice crossing national borders, Indonesia-Malaysia and then Malaysia-Brunei. Anyway, I also like to take the bus although just around Java island. :slightly_smiling_face: