ঘুরতে আমি খুব ভালবাসি। সেজন্যই আমাকে আল্লাহ ঘুরার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে আমি আল্লাহর শুকরিয়া সব সময় ই আদায় করি। আলহামদুলিল্লাহ !
ইন্ডিয়া তে গিয়েছিলাম আর আমার সৌভাগ্য হয়েছিল অনেক জায়গা ঘুরে দেখার। তার মধ্যে একটি জায়গা হল “মাউন্ট আবু” ।
ইন্ডিয়ার রাজেস্তান রাজ্যের গুজরাট বর্ডারে অবস্থিত ‘মাউন্ট আবু’।
ইন্ডিয়ার আহমেদাবাদ থেকে বাসে রওয়ানা করে প্রায় ৫/৬ ঘণ্টার জার্নি করে উদয়পুরে যেতে হবে। নন-এসি বাস ভাড়া পরবে ৩৬০/৪৮০ রুপির মত। সেখানে ২দিন থেকে ঘুরে তারপর মাউন্ট আবু যেতে পারেন। অথবা মাউন্ট আবু থেকে ফিরার পথেও উদয়পুর ঘুরতে পারেন। অথবা সরাসরিও যেতে পারেন।
উদয়পুর ঘুরার গল্প আরেকদিন বলবো । আজ শুধু ‘মাউন্ট আবু’এর কথা হবে।
উদয়পুর থেকে মাউন্ট আবুর দূরত্ব ১৬৩ কলমিটারের মত।উদয়পুর থেকে সরাসরি গাড়ি পেলে ২৫০/৩০০ রুপি লাগবে বাসে।
ইন্ডিয়ান, ইজিপ্সিয়ান, তুর্কী, আজারবাইজান, ইন্দোনেশিয়ান ও বাংলাদেশের আমি সহ ৭ জন আমাদের ঘুরার এই টিমে ছিল।
আমরা উদয়পুর ঘুরতেই বের হয়েছিলাম আহমেদাবাদ থেকে। কিন্তু একদিনে উদয়পুর যখন ঘুরা হয়ে গেল তখন-ই আমাদেরকে আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার ‘মাউন্ট আবু’ এর সন্ধান দিলেন।
‘মাউন্ট আবু’ হল আঁকাবাঁকা পথে পাহাড়ের চূড়ায় একটি ছোট সুন্দর সাজানো শহর।
আমরা সন্ধ্যা ৭ টার বাস ধরে রওয়ানা করবো বলে তড়িঘড়ি করে গেলাম। কিন্তু সরাসরি কোন বাস পেলাম না। উঠে পরলাম এক লোকাল বাসে। বাস ভাড়া নিল একেক জনের ১০০ রুপি।
আস্তে আস্তে বাস চলতে লাগলো। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর রাতে পৌঁছালাম এক নির্জন জায়গায়। আশে পাশের লোকজন জানালো - সেখান থেকে ১ঘন্টার পথ। আমরা ভাবলাম একটা জীপ বা ট্যাক্সি নিয়ে যাবো। কিন্তু সেখানের স্থানীয় লোকজন জানালো রাতের বেলা সেই রাস্তায় যাওয়া ভয়ানক। যে কোন সময় জংলী প্রাণী গাড়ি আক্রমন করতে পারে। তাই দেরি করে হলেও বাস না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।
আমরা সবাই সেখানে খোলা আকাশের নিচে ঠাণ্ডায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম চিন্তিত হয়ে।
আমরা সেই মুহূর্তে সবাই খানিকটা ভয় পেলেও পরবর্তীতে সেই সময়টাই আমাদের সবার জন্য স্মরণীয় সময় হয়।
আমরা সেখানে খোলা আকাশের নিচে একটি চায়ের দোকান আবিষ্কার করলাম।
সবার মোবাইলে চার্জ প্রায় শূন্য, আর নেটওয়ার্ক নাই বললেই চলে।
হালকা ঠাণ্ডা বাতাস আর আমাদের শুরু হল চা খাওয়া।
গান শুনে,গল্প করে, তারা দেখে আমাদের রাত কাটছিল। চায়ের টং- এ একটা বসারও জায়গা হয়ে গেল। হঠাৎ করে কোথা থেকে এক পাল গরু আর কুকুর এসে হাজির । আমাদের শুরু হয়ে গেল চিৎকার।
আমরা ছাড়াও সেখানে অন্য ইন্ডিয়ান ছিল, তাদের সাথেও আমাদের আলাপ পরিচয় হল। কোথায় ঘুরবো , কোথায় থাকবো সব কিছু আমরা সেখানে বসেই গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে ঠিক করে ফেললাম।
প্রায় শেষরাত তখন একটা বাস আসলো। সবাই দৌড় দিয়ে উঠলাম। সেই বাসের একেকজনের ভাড়া ছিল ৮০/১০০ রুপি।
বৃষ্টি শুরু হল, অন্ধকার আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা , খুবই ভয়ানক ছিল সেই রাস্তার জার্নি।
ভোরে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছলাম। তখনো বৃষ্টি আর অনেক কুয়াশা। আমরা একটা হোটেল নিয়ে ফ্রেশ হয়েই ঘুরতে বেরিয়ে পরলাম।
“মাউন্ট আবু” তে হোটেল খুবই সুন্দর, পরিষ্কার । তবে ভাড়া একটু বেশি। আমরা অনলাইন এ দেখেছিলাম ৬০০-৮০০ রুপি। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ১২০০-২৫০০ রুপি ছাড়া কোন হোটেল পাওয়া যায়নি।
পর্যটন এলাকা বলে ৩-স্টার ও ৫-স্টার হোটেল সেখানে অনেক।
চারিদিকে শুধু পাহাড় আর মাথার উপর আকাশ । আর রাস্তার চারিপাশে শুধু বানর । বানর দেখে আমি একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম বানর গুলো কোন ঝামেলা করছেনা, তখন আমাদের সবার ভয় কেটে গেল।
পাহাড়ের চুড়ায় কি চমৎকার জায়গা ! সব কিছুই যেন ছবির মত করে সাজানো। এটি একটি হিল স্টেশন। এর উচ্চতা প্রায় ১২২০ মিটার (৪০০৩ ফুট)। তাই পাহাড় আর রাস্তা দেখার মত সুন্দর। আমরা সেখানের টুরিস্ট গাইডের সাহায্য ছাড়াই গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে একটি গাড়ি সারাদিনের জন্য ভাড়া করে কয়েকটি স্পটে গেলাম। গাড়ি ভাড়া নিয়েছিল ৮০০ রুপি। গুগল ম্যাপ আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে।
যেসব জায়গাতে গিয়েছি তার মধ্যে রয়েছে-
- Nakki lake
- Toad Rock
- Sunset Point
- Universal Peace Hall
- Trevor’s Tank
- Achalgarh Fort
- Crocodile Park
পর্যটন এলাকা হওয়াতে অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে নানান রকমের দোকানের সমাগম দেখা যায়।
চুড়ি আমার খুবই পছন্দের জিনিস। সেখানে রাজেস্তানি চুড়ির অসংখ্য দোকান দেখে প্রান জুড়িয়ে যায়। আমি আমার জন্য ও আমার পরিবারের অনেকের জন্য উপহার দিব বলে অনেক রকমের চুরি কিনি।
সব জায়গা ঘুরে আমরা রাতে আবারও Nakki lake এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাই।
আমি মুসলমান বলে সেখানে হালাল খাবারের জন্য ম্যাপে খাবারের দোকান বের করে সেখানে গিয়ে রাতের খাবার খাই। খাবার সব রকম দামের ই রয়েছে। আমরা মুরগীর বিরিয়ানি খায়েছিলাম ৮০ রুপি প্লেট। তবে সারাদিনে আমরা সেখানের অনেক রকম মিষ্টি , জুস, আঁচার ইত্যাদি খেয়ে টেস্ট করেছিলাম। তুলনামূলক ভাবে সাধ্যের মধ্যেই।
পরের দিন ভোরের বাসে আমরা আবারো আমাদের গন্তব্য স্থানে রওয়ানা দেই। সরাসরি আহমেদাবাদের এসি বাস পাই যার ভাড়া ছিল ৪৫০ রুপি।
আমি শুধু সারা সময় আমার প্রিয় @পাভেল সারওয়ার কে মনে করেছি। কখনো সুযোগ হলে আমরা এক সাথেই যাবো ইনশাআল্লাহ্।
“মাউন্ট আবু” ঘুরে আসতে পারেন, কারণ যতই লিখিনা কেন , না দেখলে এর সৌন্দর্য বুঝা যাবেনা । ‘মাউন্ট আবু’ ঘুরতে যাওয়ার সঠিক সময় হল উইন্টার।
আমি ঘুরতে ভালবাসি ,আর তাই সুযোগ পেলেই ঘুরতে যাই। প্রতিটা মানুষের উচিৎ নিজের জন্য সময় বের করা। আমি প্রতি বছরই কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই, সেখানের লোকাল গাইড যারা থাকেন তাদেরকে জানাই। যত ঘুড়বেন, জ্ঞানের পরিধি বাড়বে।
লোকাল গাইডের টিমকে ধন্যবাদ, কারণ এই কমিউনিটি আমাকে শিখিয়েছে সমগ্র বিশ্বকে কিভাবে আপন করা যায় । তাই আমি যেখানেই যাই না কেন , এ পৃথিবীর সবকিছুই আমার পরিচিত মনে হয়।










