মেঘের ভেলায় শখের খেলায় সাজেক ভ্যালি

সাজেক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এই ভ্রমণে আমরা ১৮ জন ছিলাম। আগেই বলে রাখি প্রতিটা খরচের খুঁটিনাটি সম্পর্কে আমি জানিনা কারণ কারণ এটি ছিল আমাদের কোম্পানি এর পক্ষ থেকে একটা অফিসিয়াল টুর। এইখানে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো যা অন্যদের সহযোগিতা করবে।

সাজেক ভ্যালি:

সাজেক সারাবছর ই যাওয়া যায়। আর সাজেকে পাহাড়ধস বা, রাস্তা ধস এরকম কোন ঝুকি নেই। তাই নিশ্চিতেই সাজেক যেতে পারেন। বর্ষায় সাজেকের রুপ যেনো শতগুনে বেড়ে যায়। পাহাড়ের কোলে মেঘের খেলা চলে রাত ভর। সারাক্ষনই পাহাড় আর মেঘের মিতালি। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, ষোল কলা পূর্ণ। হাজারফুট উচুতে উঠে যখন মেঘের মাঝে হারিয়ে যাবেন মনে হবে অন্য এক পৃথিবী। সাজেকে সূর্য উদয় এবং সূর্যাস্তের কোন তুলনা হয় না। হারিয়ে যাবেন অন্য রকম এক প্রশান্তিতে।

সাজেক ভ্যালি, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি। কিছুদিন আগেও সাজেক খুব একটা পরিচিত ছিলো না, কিন্তু এখন সবারই প্রিয় জায়গাগুলোর মধ্যে ঠাই করে নিয়েছে সাজেক ভ্যালি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিচালনা করা এই জায়গা এখন সবধরনের পর্যটকদের মাঝে প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। সাজেক ভ্যালির অবস্থান রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সিমান্তে। কিন্তু সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও যাতায়াত সুবিধার কারনে এখানে আসতে হয় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে।

যাতায়াত:
খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার । আর দীঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার । রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই হয়ে এসে অনেক পথ হেঁটে সাজেক যাওয়া যায় । সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ি থেকে । খাগড়াছড়ি শহর অথবা দীঘিনালা হতে স্থানীয় গাড়িতে ( জিপ গাড়ি , সি.এন.জি , মটরসাইকেল ) করে সাজেকে যাওয়াই হচ্ছে বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যম । এক্ষেত্রে পথে পরবে ১০ নং বাঘাইহাট পুলিশ ও আর্মি ক্যাম্প । সেখান থেকে ভ্রমণরত সদস্যদের তথ্য দিয়ে সাজেক যাবার মূল অনুমতি নিতে হবে । একে আর্মি এসকর্ট বলা হয় । আর্মিগণের পক্ষ থেকে গাড়িবহর দ্বারা পর্যটকদের গাড়িগুলোকে নিরাপত্তার সাথে সাজেক পৌছে দেয়া হয় । দিনের দুইটি নির্দিষ্ট সময় (সকাল ১০:৩০ এবং বিকাল ৩:৩০) ব্যতীত আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ হতে সাজেক যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না । পর্যটকদের সর্বাধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয় । সাজেকগামী জিপ গাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত । সাজেক যাওয়ার পথে বাঘাইহাটে হাজাছড়া ঝর্ণা অবস্থিত । অনেক পর্যটকগণ মূল রাস্তা হতে সামান্য ট্রেকিং করে গিয়ে ঝর্ণাটির সৌন্দর্য উপভোগ করা যাই ।

যা যা দেখেছি :

সাজেক ভ্যালী , কংলাক পাড়া ( সাজেক সবচেয়ে উচু অংশ ) , হাজাছড়া ঝরনা , আলুটিলা রহস্যময় সুড়ঙ্গ , রিছাং ঝরনা, প্যাগোডা, তারেং, নিউজিল্যান্ড পারা, দিঘীনালা ঝুলন্ত ব্রীজ, রাবার ড্যাম, দিঘীনালা বন বিহার।

ট্যুর প্ল্যানঃ

আমরা ১৪ নভেম্বর রাতের ১০.৪৫ এর গাড়িতে করে (সৌদিয়া পরিবহন) খাগড়াছড়ি চলে যান। আগেই চান্দের গাড়ির সাথে যোগাযোগ করে বুকিং দিয়ে রাখবেন তারা আপনাকে সকালে বাসস্ট্যান্ড থেকে রিসিভ করবে। তারপর নাস্তা করে ৭/৩০ বা ৮ টার মধ্যে রওনা দিয়ে ৯ টার মধ্যে চলে যান দিঘীনালা তারপর হাজাছড়া ঝর্ণা। সেখানে ১ ঘন্টা গোসল করে আর্মির এসকর্ট ধরুন ১০ টা ৩০ মিনিটের মধ্যে কারন এর পরে গেলে আর্মির এসকর্টের সাথে যেতে পারবেন না। তখন আবার বিকেলে যেতে হবে, সাজেক যাওয়াটাই বৃথা হয়ে যাবে।

আর্মি এসকর্ট নাম এবং সিগনেচার দিয়ে রওনা হয়ে যান। উচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা বন জংগল দেখতে দেখতে ১২/১ টার মধ্যে পৌছে গেলাম সাজেক। আগে থেকে বুকিং করা কটেজে চলে যান সোজা। তারপর রেস্ট নিন, লাঞ্চ করুন। বিকেলের দিকে হ্যালিপ্যাড, স্টোন গার্ডেন, আশে পাশের পাড়া বেড়িয়ে আসুন, ছবি তুলতে চাইলে ছবি তুলুন কারন ছবি তোলার আর সুযোগ হবে না।

পরদিন সকালে উঠবে ৫ টা থেকে ৬ টার মধ্যে কারন কংলাক পাহাড় দেখতে যেতে হবে। এটা মিস মানে অনেক বড় কিছুই মিস তাই একটু কষ্ট করে ঘুম বিসর্জন দিয়েই উঠু পরুন। ৩০-৪০ মিনিট ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়ে চলে যান রাস্তা একটাই তাই খুব সহজে যেতে পারবেন। কংলাক এর মাথায় সুন্দর বসার জায়গা আছে এবং সকালে এখানে পুরোটা মেঘে ঢাকা থাকে। ৯ টার মধ্যে কংলাক পাড়া ঘুরে কটেজে চলে আসুন। ১০ টার মধ্যে ব্যাগ ঘুছিয়ে নাস্তা করে ১০ টা ৩০ মিনিটে চান্দের গাড়িতে করে আর্মির এসকর্ট সাথে খাগড়াছড়ির পথে রওনা দিন।

মেঘে ঢাকা সাজেকের প্রকৃতি:

সাজেক গমণের পথের একাংশ:

সাজেকের হেলিপ্যাডের দৃশ্য :

কংলাক পাহাড়:

কংলাক পাহাড়ের উপরে কংলাক পাড়া অবস্থিত। সাজেক ভ্যালি মূলত রুইলুই পাড়া এবং কংলাক পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। কংলাক পাহাড় থেকে লুসাই পাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। চারদিকে পাহাড় , সবুজ আর মেঘের অকৃত্রিম মিতালী চোখে পড়ে । সাজেক ভ্রমণরত পর্যটকদের কাছে এটি এখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রুইলুই পাড়া হতে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরত্বে এটি অবস্থিত; সাজেকের হ্যালিপ্যাড হতে ৩০-৪০ মিনিট ট্রেকিং করে কংলাক পাড়ায় যেতে হয়।

আলুটিলা গুহা:

প্রাকৃতিক রূপ :

সাজেকে সর্বত্র মেঘ , পাহাড় আর সবুজের দারুণ মিতালী চোখে পড়ে । এখানে তিনটি হেলিপ্যাড বিদ্যমান ; যা থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায় । সাজেকে একটা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হচ্ছে এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তিনটা রূপই দেখা মিলে । কখনো খুবই গরম , একটু পরেই হটাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিকে ঢেকে যায় মেঘের চাদরে ; মনে হয় যেন একটা মেঘের উপত্যকা । সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়-এ যাওয়া যায় । কংলাক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া । কংলাকে যাওয়ার পথে মিজোরাম সীমান্তের বড় বড় পাহাড় , আদিবাসীদের জীবনযাপন , চারদিকে মেঘের আনাগোনা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয় । বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত আদিবাসীদের উৎসবের সময় তাদের সংস্কৃতির নানা উপকরণ পর্যটকরা উপভোগ করতে পারবেন।

জুমঘর রিসোর্ট :

সন্ধ্যার পরে বার বি কিউ:

কটেজের লোককে বললেই তারাই সব ম্যানেজ করে দিবে। যদি ছোট গ্রুপ হয় তাহলে রুইলুই পাড়ায় গির্জার সামনে প্রতিরাতেই বার বি কিউ করে সেখান থেকে অর্ডার দিয়ে খেতে পারেন। আর, রাত ২/৩ টায় একবার বেড়িয়ে রুইলুই পাড়ার রাস্তায় হাটাহাটি করতে পারেন। পূণিমা থাকলে আর মেঘ থাকলে অসাধারন এক অভিজ্ঞতা হবে।

চাঁদের গাড়ি:

কোথায় খাবেন?

এই পার্টটা টা আমার সবচেয়ে পছন্দের পার্ট। হাহা। সাজেকে খাবার সংকট আছে তাই আগে থেকেই মানে যাওয়ার আগেরদিন ই যেখানে থাকবেন তাদের খাবার অর্ডার করে রাখবেন। দুপুরে যা খেতে পারেনঃ জুমের ভাত, পাহাড়ি মুরগীর মাংস, ভর্তা ২-৪ রকমের, পাহাড়ি বিভিন্ন শাক সব্জী, ডাল ইত্যাদি। খাবারের দাম ওখানে বেশি পার প্লেট ১৮০-২৫০ পর্যন্ত হতে পারে। দামদর করে নিবেন।

রাতের খাবার অবশ্যই পরোটা, বার বি কিউ এবং সব্জি বেস্ট ম্যানু আমার কাছে। পরদিন খাগড়াছড়ি ফিরে খাং মং অথবা, সিস্টেম রেস্টুরেন্ট ডিনার করতে পারেন, তবে সিস্টেম আর খাং মং একই খাবার কিন্তু সিস্টেমে দাম ডাবল প্রায়, লুসাই রেস্টুরেন্ট এ খেতে পারেন।

ব্যক্তিগত মতামত -

সাজেক পার্বত্য এলাকা, এখানের সৌন্দর্য আমাদেরকে কাছ থেকে দেখতে সেখানের আদিবাসীরাই মূল সাহায্য করে থাকেন। তাই সেখানে গিয়ে অযথাই কারো সাথে কটুকথা বলবেন না, বা তাদের আচরন, জীবন ব্যবস্থা বা তাদের কোন কিছু নিয়েই হাসিঠাট্টা করবেন না। তাদের সাথে আপনি যেমন আচরন করবেন তারাও ঠিক তাই করবে, ভেবে দেখুন তাদের সেখানে বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা নেই, নেই খাবার পানির ব্যবস্থা, তাও তারা পর্যটকদের জন্য সব কিছুর যোগান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, তাই সেখানে গিয়ে কারো সাথেই বাজে আচরন বা তারা খারাপ ভাবে নেয় এমন কিছু করবেন না। আর পরিবেশের দিকে খেয়াল রাখবেন, অপচনশীল জিনিসপত্র ব্যবহারে আরো সচেতন হোন, পরিবেশকে বাচতে সহায়তা করুন। আপনার ভ্রমণ আন্দদের হোক।:v::v:

মেঘের পরে মেঘ উড়ে যায়…সাদা মেঘের ভেলা
মেঘের রাজ্যে মেঘ করেছে
এ কেমন মেঘের খেলা :sunglasses: :sunglasses: :sunglasses:

সকল ছবি হাতে না পায়ে অল্প আকারে লিখলাম, শিগ্রই পুরো লেখা তা আপডেট করবো। ধন্যবাদ সবাই কে।

38 Likes

Hi @Sagir_Ahmmed !

Thanks for sharing your valuable post and Photo’s.

It’s really very beautiful and eye-catching.

Cool, You have enjoyed a lot there.

If you could add some more information about your experience there and it is a brief notes it will more interesting to note bu our community LG’s.

Wishing for many posts @Sagir_Ahmmed .

3 Likes

@Selvamani_R some information is missing, I will update it when i got all of our photos. some places will be added. when I update it, I will tag you. Thank you.

7 Likes

সাজেক ভ্যালি বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। সাজেক ঘুরতে গিয়ে প্রথমেই আসে রুম এর কথা। সাজেকের সেরা কয়েকটি রিসোর্টের একটি রিসোর্ট রুংরাং। রুংরাং রিসোর্টে সর্বমোট ৮টি রুম রয়েছে। এর রুম ভাড়া ২০০০টকা থেকে শুরু। রিসোর্টের লোকেশন চমৎকার।