জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া, নিউইয়র্কের নায়াগ্রা কিংবা ভেনেজুয়েলার এনজেল জলপ্রপাত নয়, গল্পটি আমাদেরই সবুজ পাহাড়ের বুকে মাত্র কিছুকাল আগে ‘হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া’ খৈয়াছড়া ঝর্ণাধারার। অল্প কিছুদিনেই বেশ নাম কামিয়েছে। এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া অবধি! বিশ্ববিখ্যাত জলপ্রপাতে শিহরণ আমাকে আজও ছুঁতে পারেনি। হৃদয় ছুঁয়ে নিয়েছে এই খৈয়াছড়ার গহীন পাহাড়ের ঝর্ণা। শোঁ শোঁ আওয়াজে মন হারিয়ে যায়, হিম শীতল পরশে ভিজে ওঠে হৃদয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত যারা যাতায়াত করেন, মিরসরাই এবং ভাটিয়ারীর মাঝখানে রাস্তার পূর্ব পাশে চোখ রাখলেই দেখে থাকবেন সুবিশাল পাহাড় রয়েছে দাঁড়িয়ে। পশ্চিমেই বঙ্গোপসাগর। পাহাড়সারি যেন সাগরের পানেই চেয়ে আছে। কিন্তু এই পাহাড়ের ভেতরেই যে একের পর এক ঝর্ণাধারা বয়ে চলেছে যুগ-যুগান্তর, সেটি কে জানতো! মিরসরাই উপজেলায় অবস্থিত খৈয়াছড়া ঝর্ণার বিশেষত্ব হলো, এখানে রয়েছে ঝর্ণার একে একে ১২টি স্তর!
যদি সুযোগ মেলে ঘুরে আসুন প্রকৃতির এই নৈসর্গ থেকে। কিছুদিন আগে আমি গিয়েছিলাম। আগে থেকেই জানতাম যে, খৈয়াছড়া ঝর্ণা অবধি যেতে ঘাম ছুটবে। কিন্তু সেই ঘামটা যে সত্যিকার অর্থে বৃষ্টিধারায় শরীরটা ভিজিয়ে দেয় গিয়ে বুঝলাম। দীর্ঘ পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ হেঁটে ঝর্ণার সামনে যেতেই জাস্ট ওয়াও!
মাথার ওপর সূর্য যখন, ঠিক তখনই দুর্গম পথটা পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছে জন্মালো। অবেলার সিদ্ধান্তে খাড়া সূর্যের প্রখর রোদে খৈয়াছড়ার দিকে ছুটে চললাম। জায়গা মতো গিয়ে বুঝলাম, সময়টা অবেলা হলেও নিছক মন্দ ছিল না। কারণ, আরেকটু দেরি হলেই একুল-ওকুল দুকুলই হারাতাম।
ওই পিচ্ছিল পথটা পাড়ি দিতে হলে সবার আগে সকাল সকাল যাওয়াই ভালো। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি অসম পথটা রোমাঞ্চের চাইতেও দুর্গম হয়ে ওঠে। মানুষের ভিড় বাড়ে, ঝর্ণা-দর্শন শেষে মানুষ ফেরে, আর পথিকের ভেজা শরীর থেকে টুপ টুপ করে গড়িয়ে পড়ে ঝর্ণার পানি। তাতেই মূলত পথটা ধীরে ধীরে পিচ্ছিল হয়ে যায়। তখন জুতাপায়ে কিংবা খালিপায়ে দুভাবেই হাঁটা দায়। চলতি পথেই দলটা ভারী হয়ে ওঠে। ফিরতি পর্যটকেরা অভয় দেন, সঙ্গে সতর্কতাও।
ঝর্ণার সামনে গিয়ে রীতিমত অভিভূত হয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম পাহাড়ের কান্না। পাহাড়ের গর্জনে শিহরণ বাড়ছিল। একটু মায়া, সংহতি। পরক্ষণেই লোভ সংবরণের কাছে পরাজয়। ঝাঁপিয়ে পড়লাম ঝর্ণার পানিতে। ওপর থেকে অঝোর ধারায় ধেয়ে আসা ঝর্ণার প্লাবনের বিপরীতে বেশিক্ষণ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যে কোন শক্তিমান মানুষের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব। একদিকে ঝুঁকি, অন্যদিকে পরম আনন্দ!
খৈয়াছড়া ঝর্ণা সামনে থেকে দেখলে যে কেউই এর প্রেমে পড়ে যাবেন। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, এতটা অভিভূত আপনি এর আগে কোথাও কখনও অন্য কোনো ঝর্ণা দেখে হতে পারেননি। সময়স্বল্পতা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে খৈয়াছড়া ঝর্ণার ওপরের আরো তিনটি ধাপ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। বেশ কিছুক্ষণ পাহাড়ের স্বচ্ছ জলের সঙ্গে জলকেলি খেলেও যেন বাসনা পূর্ণ হয় না।
ছোটবেলায় পুকুরের পানিতে কত্ত লাফালাফি, উল্টো ডিগবাজি, দুরন্তপনা- সেইসব স্মৃতিগুলোর পুণরাবৃত্তি এই ঝর্ণার সামনে। ঈদের ছুটিতে বহু মানুষের তীর্থস্থান হয়ে ওঠে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়ার এই জায়গাটি। তবে দীর্ঘপথ হাঁটার চাইতেও বড় বিড়ম্বনা সেখানকার নিরাপত্তার বিষয়টি। অর্ধেকেরও বেশি দূরত্বে কোন রাস্তা নেই। যেতে হয় পাহাড়ের পাদদেশে, ছরার জলে কিংবা পাহাড়ের গাছ-গাছালির ফাঁকে ফাঁকে হেঁটে।
মনে মনে বহু স্বপ্ন এঁকেছি। কল্পনা করেছি। আমি যদি অমুক হতাম, কত কিছুই না করতাম। খৈয়াছড়া ঝর্ণার অপরূপ দৃশ্যকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে সম্ভব সবকিছুই করতাম। কিন্তু আমি যেহেতু সাধারণ নাগরিকের কাতারে, সুতরাং সবই স্বপ্ন, সবই নিছক কল্পনা।
আমি স্বপ্নচারী। আশাহত হই না। খৈয়াছড়া ঝর্ণার আসল সৌন্দর্য পৃথিবীকে চেনাতে সম্ভব সবকিছুই করবে সরকার। আমি আশাবাদী। সেদিনের আশায় দিন গুণি। যেন বহুকাল ধরে বারেবারে ছুটে চলি, ভিজে যাই পাহাড়ের অশ্রুজলে।
যদি যেতে চান :
রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, সায়েদাবাদ জনপথের মোড়, আমারবাগ, ফকিরাপুল, টিটিপাড়া, পান্থপথ থেকে ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত এসি-ননএসি বহু বাস নিয়মিত চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে ১৮৭ কিলোমিটার পর মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজারের পূর্ব পাশে থামতে হবে। তারপর বামে সংযোগ সড়ক হয়ে যেতে হয় খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। আর, চট্টগ্রামের দিক থেকে যদি যেতে চান তাহলে চট্টগ্রাম সিটি গেইট থেকে ৫৫ কিলোমিটার গিয়ে ডানের সংযোগ সড়কে প্রবেশ করতে হবে। এদিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়ক যানবাহন চলাচলের যোগ্য। বাকি প্রায় আড়াই কিলোমিটার যেতে হবে পায়ে হেঁটে।





