লাভা সম্পর্কে শুনেছিলাম আমার ভ্রমণপিপাসু চিকিৎসক বন্ধু হরিপদ সরকারের মুখে। শিলিগুড়ি থেকে লাভা যাওয়ার পথটি নাকি অসাধারণ। তাই এবারের ভারত ভ্রমণে দার্জিলিংয়ের বাইরে লাভাকে অন্যতম গন্তব্য হিসেবে ঠিক করেই রেখেছিলাম। আর লাভা ভ্রমণের সেই সুযোগ এসে গেল ১৬ অক্টোবর সকালে। আমার মেঝদিদি, জামাইবাবু, ভাগ্নে, আমি আর ববি-এই পাঁচজন মিলে শিববাড়ী থেকে একটা মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে সোজা গেলাম শিলিগুড়ি মোড়।
সেখানে সাড়ে চার হাজার রুপিতে একটা টাটা সুমো জিপ ভাড়া করে রওনা হলাম লাভার উদ্দেশে। শিলিগুড়ি থেকে সেবক ব্রিজ পেরিয়ে ডামডিম-গরুবাথান হয়ে আমরা লাভার পথে যাত্রা শুরু করি। শিলিগুড়ি থেকে লাভার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মতো। গাড়ি ভাড়া করে এ পথে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা। প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লাভার নৈসর্গিক শোভা নাকি অতুলনীয়।
আমরা সকাল ৯টায় শিলিগুড়ি মোড় থেকে যাত্রা শুরু করি। চলতে চলতে পাহাড়ি রাস্তার ইউটার্নের মতো বাঁক পড়ে। এরই একটা বাঁক পেরিয়েই টাইগার ব্রিজ। স্থানীয়ভাবে সেবক ব্রিজ নামেও পরিচিত। সেবক নাম কেন জানা হয়নি, তবে ব্রিজ পেরিয়ে রাস্তার দুইপাশ জুড়ে মানুষের সেবা নেওয়ার জন্য বসে থাকা বানরের দল সঙ্গ দিলো অনেকটা দূর। একপাশে উঁচু পাথুরে পাহাড়, গাছ। একপাশে খাঁদ। সঙ্গে দেখা দুই বাংলার অতি পরিচিত নদী তিস্তা।
ব্রিজটি তিস্তার ওপরেই। নদীতে পানি নয়, দেখা গেলো শুধু পাথুরে ধারা। মনটা একটু খারাপই হলো। আমরা এই ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। বড় উঁচু পাহাড়ে চড়া শুরু হলো ব্রিজ পেরিয়েই। ব্রিজটি দার্জিলিংকে যুক্ত করেছে জলপাইগুড়ি জেলার সঙ্গে। উত্তর-পূর্ব দিকে গরুবাথান হয়েই পৌঁছাতে হবে লাভা। গরুবাথান সংরক্ষিত বন। বড় বড় শাল-সেগুন দেখা মিলল বনে। ভেতর দিয়ে মসৃণ রাস্তা চলে গেছে টানেলের মতো। বনে চরা গরু দেখা মিললো ক্ষণে ক্ষণে। গলায় আবার ঘণ্টি বাঁধা। গরুবাথানের অনেকটা আবার সেনাবাহিনীর দখলে। মাঝে-মধ্যে রয়েছে সমতলের সবুজ চা বাগান। পাহাড়ের ঢালে অসাধারণ সুন্দর সেই সব বিশাল চা-বাগান।মসৃণ পিচঢালা রাস্তায় গাড়ি ছুটছিল বেলাগাম ঘোড়ার মতো। মাঝে পড়ে নাগরাকাটার ভয়ানক জঙ্গল। লাভার রাস্তা খুব ভয়ানক, আর সেই সাথে নিচে গভীর খাদ। লাভা যাওয়ার পথে অনেকগুলো মাইলস্টোন আমাদের পার হতে হয়। পার হতে অনেক ছোট ছোট জনপদ। ছোট ছোট পাহাড়ি জনপথগুলো অনেক না জানা কথা গুটিয়ে রাখে ওদের অনাহূত খেলনা ঘরে। সেরকম অনেক কিছুই ভেসে উঠছিল আমাদের চোখের ধূসর আলোয়।