বাংলাদেশে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রমনা পার্ক অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অনবদ্য এক প্রশান্তির স্থান। ঢাকা শহরের ফুসফুস বা হার্ট বলা হয় যাকে। কারণ এটি ঠিক শহরের প্রাণকেন্দ্রে একমাত্র সবুজ বেষ্টনী। প্রতিটি ঋতুতে এই পার্কটি ভিন্ন ভিন্ন রুপ ধারন করে। বর্ষাকালে এই পার্কটি একটি অত্যাশ্চর্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়, যা প্রকৃতিপ্রেমী এবং যারা শহরের জীবনের ক্লান্তি ও তাড়াহুড়ো থেকে বিশ্রাম চায় তাদের জন্য একটি মনোমুগ্ধকর আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাস
বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা মাটি ছুঁলেই রমনা পার্কে জেগে ওঠে নতুন প্রাণ। নতুন প্রান প্রকৃতিতে সতেজতা ফিরে এসে পার্কটিকে করে তুলে বৈচিত্রময়। পার্কের গাছ, ঝোপঝাড় এবং ঘাসগুলি প্রাণবন্ত এবং ললিত হয়ে ওঠে, চার পাশ প্রানবন্ত সবুজ সতেজ এবং পুনরুজ্জীবিত হয়। বৃষ্টির ফোঁটা পাতায় এবং নীচের মাটিতে মৃদুভাবে পড়ার শব্দ একটি প্রশান্তিদায়ক সিম্ফনি তৈরি করে, যা আগত দর্শনার্থীদের শান্ত পরিবেশে নিজেকে নিমজ্জিত করতে অফুরান আমন্ত্রণ জানায়। পার্কের বিস্তৃত লনগুলি নরম কোমল সবুজের একটি কার্পেটে পরিণত হয়। রঙিন ফুলের সাথে বিন্দু বিন্দু জল যা বৃষ্টির প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠে। সমৃদ্ধ, সবুজ পাতা এবং ফুলের উজ্জ্বল বর্ণের সংমিশ্রণ একটি মনোরম দৃশ্য তৈরি করে যা চোখের জন্য সত্যি প্রশান্তিদায়ক। এই সময়টা ফটোগ্রাফার এবং প্রকৃতি ও উদ্ভিত প্রেমিদের জন্য বেশ উপযুক্ত একটি সময়।
মোহনীয় মন্ত্রমুগ্ধ লেক
বর্ষাকালে রমনা পার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে পার্কের নির্মল লেক। শীত এবং গ্রীষ্মের পরে পানি কমে যাওয়া লেকে বৃষ্টির জল হ্রদকে কানায় কানায় ভরাট করে ফেলে, যার ফলে এটি স্ফিত হয়ে চারপাশে বেশ প্রসারিত হয়ে যায়। জলের উপরিভাগে ছোট ছোট ঢেউ আর একটা স্পন্দন তৈরি করে অবারিত বৃষ্টির ফোঁটা যে দৃশ্য সত্যই মন্ত্রমুগ্ধকর। দর্শনার্থীরা প্রায়ই লেকের ধারে ওয়াক ওয়য়েতে অবসরে হাঁটাহাটি করে। অনেকে ভিজে ভিজে সেই বৃষ্টিকে উপভোগ করে। শীতল বাতাস এবং মৃদু বৃষ্টির শান্ত প্রভাব মনকে উৎফুল্ল ও আন্দোলিত করে। লেকে কিছু হাঁস এবং রাজহাঁস এর অবাদ বিচরন চোখে পরে। এই সুন্দর প্রাণীগুলি বৃষ্টির আগমনে আনন্দিত বলে মনে হয় এবং তাদের জলের উপর চমৎকারভাবে সাতার কাটতে দেখা একটি মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। তাছাড়া বৃষ্টিস্নাত গাছগুলো কাঠবিড়ালীর এদিক ওদিক ছুটাছূটি বেশ ভালো লাগার মত। অনেক দর্শনার্থী এই সুন্দর পাখির কাছাকাছি যেতে এবং হ্রদের নির্মলতা উপভোগ করতে প্যাডেল বোট ভাড়া নিয়ে থাকে।
প্রশান্তিতে হারানোর স্থান
বর্ষাকালে রমনা পার্ক শহরের জীবনের কোলাহল এবং বিশৃঙ্খলা থেকে একটি আদর্শ পরিত্রাণ পাবার জায়গা। প্রতিদিন সকালে অনেক অনেক লোক আসে এখানে শরীরচর্চা করতে। আর ছুটির দিনে আসেন অনেক বেড়াতে প্রিয়জনদের নিয়ে। তাজা, নির্মল বাতাস, বৃষ্টিতে ভেজা মাটির মাটির ঘ্রাণ এবং বৃষ্টি ও পাখির ডাকের প্রাকৃতিক সিম্ফনি নির্মল প্রশান্তির পরিবেশ উপভোগ করতে। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে আপনি দৈনন্দিন জীবনের চাহিদাগুলি থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন, অবসরে হাঁটতে পারেন, বা কেবল পার্কের একটি বেঞ্চে বসে নিজেকে শুধুমাত্র নিজের চিন্তায় হারিয়ে ফেলতে পারবেন৷ তবে শহরের এই পার্কে খুব বেশি বৃষ্টিপাত হয়না। আপনি চাইলে যেদিন বৃষ্টি হয় বা হবার সম্ভাবনা রয়েছে সেদিন এসে সেই স্বর্গীয় সুন্দর পেতে পারেন।
ফটোগ্রাফির উপযুক্ত স্থান
যারা প্রকৃতির ছবি তুলতে পছন্দ করেন, যারা বৃষ্টির ভালোবাসেন তাদের জন্য, বর্ষায় রমনা পার্ক একটি স্বপ্ন পূরণ এর জায়গা। আলো এবং জলের ইন্টারপ্লে, ফুলের প্রাণবন্ত রঙ এবং হ্রদে ভেজা বৃক্ষের প্রতিফলন অত্যাশ্চর্য শট ক্যাপচার করার জন্য অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। আপনি একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার হোন বা না হোন আপনার একটি স্মার্টফোন দিয়েই ছবি তোলা এবং ভিডিওগ্রাফি করতে পারবেন। আপনি পার্কের প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন নতুন ফ্রেম, নতুন ভিউ পাবেন যা আপনার ফটোগ্রাফিতে বেশ অনুপ্রেরনা যোগাবে।
বিশেষ কিছু সতর্কতা
বর্ষায় রমনা পার্কে যাওয়ার সময়, নিজেকে শুকনো রাখার জন্য ছোট ছাতা বা রেইনকোট নিয়ে আসতে পারেন। তাছাড়া পার্কের ভেতরে কিছু ছোট ঘর/শেল্টার রয়েছে সেখানেও বসে বৃষ্টি উপভোগ করা যায়। ভেজা পথ বা ঘাসে হাঁটার জন্য উপযোগী জুতা পরুন, সেটা প্লাস্টিক অথবা ওয়াটারপ্রুফ হতে পারে। দুপুরের রোদ এবং ভিড় এড়াতে ভোরে বা শেষ বিকেলে যান। প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের জন্য পার্কে হুইল চেয়ার নিয়ে প্রবেশ করা যায়, তাছাড়া দুই একটা গেটের পাশে পার্কিং এর ব্যবস্থা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্ষায় রমনা পার্ক সত্যিই একটি মনোমুগ্ধকর জায়গা। ধোয়া, দুষন আর শব্দের দাঙ্গায় নিজেকে একটু প্রশান্তি দিতে রমনা পার্ক একটি উৎকৃষ্ট পার্ক। বর্ষাকালে প্রকৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে। রমনা পার্ক একটি গ্রীন স্পেস বা নেচার পার্ক, এই ধরনের স্থানগুলি সাধারণত ইকোসিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং এটি মানব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। এই পার্কের প্রকৃতি, শহরের বায়োডিভার্সিটি এবং উদ্ভিদ ও প্রানী সংরক্ষণ জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে হারানো, একটি স্মরণীয় ফটোগ্রাফির অভিজ্ঞতা, বর্ষাকালে রমনা পার্ক এই সব ছাড়াও আরও অনেক কিছু দেখার এবং শেখার প্রতিশ্রুতি দেয়। রমনা পার্কের সংরক্ষণ রক্ষনাবেক্ষনের কাজ জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আগত দর্শনার্থীদের শিক্ষা এবং সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বছরের এই সময়ে ঢাকার যেকোনও প্রান্ত থেকে সহজে চলে আসতে পারেন। আপনার ভ্রমণ তালিকায় যুক্ত হোক বর্ষায় রমনা পার্কের অভিজ্ঞতা।






