চর কুকরি মুকরী বাংলাদেশের ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় অবস্থিত একটি দ্বীপ। এটি ভোলা জেলার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। এটি মেঘনা ও তেতুঁলিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। চর কুকরি মুকরির আয়তন প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার।
চর কুকরি মুকরী একটি অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত দ্বীপ। এখানে রয়েছে নানা রকমের গাছপালা, ফুল, ফল। এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বন্যপ্রাণী। চর কুকরি মুকরীতে প্রতিবছর শীতকালে প্রচুর পরিমাণে অতিথি পাখি আসে।
চর কুকরি মুকরী একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এখানে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক আসে। চর কুকরি মুকরীর প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখানে রয়েছে সুন্দর সুন্দর সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, বন্যপ্রাণী।চর কুকরি মুকরী ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হলো শীতকাল। শীতকালে এখানে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং অতিথি পাখিরা আসে।
চর কুকরী মুকরী প্রবেশ পথ
দু পাশে কেওড়া বন মাঝ খান দিয়ে ভয়ে চলেছে নদী
জেলেরা মাছ শিকার করছে
ওয়াচ টাওয়ার এর পাশে বাঁশের সাঁকো
গত ২১ আগষ্ট আমি আর আল আমিন ভাই এক সাথে চর কুকরি মুকরী ভ্রমণে গিয়েছিলাম। আমরা ঢাকা থেকে সরাসরি ভোলা চলে গিয়েছিলাম।আমরা অভয়ারণ্যটি ঘুরে দেখতে বের হই একদিনের সময় নিয়ে। আমরা অভয়ারণ্যের ভেতরে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখতে পেলাম। চর কুকরি মুকরী নৌকা ভ্রমণ ছিল খুবই উপভোগ্য। আমরা নদীর দুপাশের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। নদীর ধারে ম্যানগ্রোভ বন, ছোট ছোট গ্রাম, এবং দূরে দূরে কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ দেখা যাচ্ছিল। ঢাল চর কুকরি থেকে খুবই নিকট বর্তি দ্বীপ।অন্য কোন সময় ঢাল চর থেকেও ঘুড়ে আসবো।
ভোলা জেলার বাইরে থেকে যারা চর কুকরি মুকরী ভ্রমণে আসবেন তাদের জন্য একটা প্ল্যান দিয়ে দিলাম সময় সুযোগ করে ঘুড়ে আসুন অসাধারণ এই দ্বীপ থেকে।
ঢাকা থেকে নিয়মিত ভোলা জেলায় যাওযার জন্য লঞ্চ রয়েছে। সদর ঘাট থেকে ফারহান ৬ ও টিপু ১৩ সহ আরো বেশ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করে।সব গুলো লঞ্চ সন্ধ্যা ৭-৮ টার সদর ঘাট ত্যাগ করে। ডেকের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং কেবিন সিংগেল ১৬০০ এবং ডাবল ২০০০-২২০০ টাকা এর ভিতর।
ফারহান এবং টিপু লঞ্চ দুইটি যায় ভোলার চর ফ্যাশন এর বেতুয়া ঘাট পর্যন্ত। এছাড়া আরো কিছু লঞ্চ রয়েছে যেগুলো যায় কলমি লঞ্চ ঘাট বা বাবুর হাট লঞ্চ ঘাট।
আপনারা চাইলে বেতুয়া ঘাট দিয়েও যেতে পারবেন আবার বাবুর হাট লঞ্চ ঘাট দিয়েও যেতে পারবেন।দুই দিক দিয়ে যাওয়া যায়।
লঞ্চ বেতুয়া ঘাট নামিয়ে দিবে সকাল ৬ টায়। ঘাটে নেমেই অটো পেয়ে যাবেন, অটো করে চলে যাবেন চর ফ্যাশন । চর ফ্যাশন জন প্রতি ভাড়া নিবে ৩০ টাকা। চর ফ্যাশন অটো থেকে নামার সাথে সাথে চোখে পড়বে ভোলার আরেক আকর্ষণ জ্যাকব টাওয়ার। টাওয়ার ঘুরে আসে পাশের হোটেল থেকে সকালের নাস্তা সেরে পাশে থাকা বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ আইচা এর বাসে উঠে যাবেন।জন প্রতি ভাড়া নিবে ৫০ /৬০ টাকা।এর পর দক্ষিন আইচা নেমে আবার অটো নিয়ে চলে যাবেন কচ্ছপিয়া ঘাট , জনপ্রতি ভাড়া নিবে ২০ টাকা, রিজার্ভ নিলে নিজেদের মতো করে দরদাম করে নিবেন।
আর যারা বাবুর হাট লঞ্চ ঘাট দিয়ে আসবেন (এটাও নামিয়ে দিবে ৬-৭ টার ভিতর) তারা লঞ্চ থেকে নেমে অটো রিজার্ভ করে সরাসরি চলে যাবেন কচ্ছপিয়া ঘাট। জনপ্রতি ৬০/৭০ টাকা নিবে অটো ভাড়া এই রুটে কোন বাস নেই। ঘাটে হয়তো ভাড়া বেশি চাইতে পারে এর জন্য ৫ মিনিট হাটলে ঘাট থেকে একটু সামনে বাবুর হাট বাজার সেখানে অনেক অটো পাবেন ওখান থেকে দাম করে গাড়ি নিতে পারবেন।
কচ্ছপিয়া ঘাট ঘাট থেকে লোকাল টলার আছে দুই সময় একটা দুপুর ১২ টায় ছেড়ে যায় এবং কুকরি থেকে আসে ২ টায়।আরেকটা আছে কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে যায় বিকাল ৪ টায় এবং সেটা কুকরী থেকে পরের দিন সকালে ১০ টায় ছেড়ে আসে।ভাড়া জন প্রতি ৭০ টাকা।
আমরা সকালে কুকরী যাওয়ার সময় টলার এর অপেক্ষা না করে স্পিড বোট নিয়ে চলে গিয়েছিলাম(কারণ আমাদের প্ল্যান ছিলো দিনে গিয়ে দিনেই ব্যাক করবো তাই বোট এর অপেক্ষা না করে স্পিড বোট এ গিয়েছিলাম এবং দুপুর ২ টার বোটে ব্যাক করি) স্পিড বোট ভাড়া জন প্রতি ২০০ টাকা তবে সমস্যা হচ্ছে ৮ জন না হওয়া পর্যন্ত বোট ছাড়বে না।টিম নিয়ে গেলে বোটের জন্য সময় নস্ট না করে স্পিড বোট নিয়ে চলে যাওয়া ভালো ।
চট্রগ্রাম থেকে যারা যাবেন :
ডাইরেক্ট গাড়ি: চট্রগ্রাম অলংকার,বড় পুল,ফ্রী পোর্ট, ও বদ্দার হাট থেকে সরাসরি গাড়ি রয়েছে ভোলা চর ফ্যাশন এর। সীমান্ত, শতাব্দি, যমুনা,মেঘনা, সোহাগ ইত্যাদী পরিবহন এর গাড়ি নিয়মিত যাতায়াত করে। চট্রগ্রাম থেকে সব গুলো গাড়ি ছাড়ে বিকাল ৪-৫ তার মধ্যে বর্তমান ভাড়া ৭০০ টাকা ।তবে এই গাড়ি গুলোতে গেলে সময় একটু বেশি লাগে কারন লক্ষ্মীপুর ফেরি ঘাটে অনেক ক্ষন বসে থাকতে হয়।এই গাড়িতে যাওয়ার পর আপনাদেরকে চর ফ্যাশন নামিয়ে দিবে এর পর বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ আইচা এর বাসে উঠে যাবেন। এর পর উপড়ের প্ল্যান মতো করে আইচা চলে যাবেন। ডাইরেক্ট বাসে গেলে একটা সুবিধা বার বার গাড়ি পরিবর্তন করতে হবে না,আর ভাড়া তুলনা মূলক কম খরচ হবে।
ভেঙে ভেঙে গেলে: চট্রগ্রাম অলংকার,বড় পুল,ফ্রী পোর্ট এই তিন জায়গা থেকে শাহী এবং জোনাকি নামে ২টি পরিবহন রয়েছে যা নিয়মিত যাতায়াত করে।সকাল ৬ টা থেকে রাত ১২ টা পযন্ত গাড়ি গুলো সার্ভিস দিয়ে থাকে।তবে কুকরী এর টলার এর সময় মিল রেখে যাওয়ার জন্য সব থেকে ভালো হবে রাতের গাড়িতে রওনা করা।সকালে গাড়িতে গেলে সন্ধ্যায় চর ফ্যাশন পৌঁছালে রাতে হোটেলে থাকতে হবে তাই চট্রগ্রাম থেকে রাত ১০/১১ টার বাসে রওনা হলে সকাল ৭-৮ টার ভিতরে চর ফ্যাশন পৌঁছে যাবেন।
চট্রগ্রাম থেকে মজুচৌধুরী হাট ফেরি ঘাট বাস ভাড়া নিবে ৪০০-৫০০ টাকা।বাস ঘাটে নামিয়ে দিবে রাত ২-৩ টার ভিতর ,এই গাড়ি ঘাটে যাওয়ার পরেই লঞ্চ ছাড়বে।তবে ভোর ৪-৫ টার ভিতর লঞ্চ ছেড়ে যায়।লঞ্চ নামিয়ে দিবে ভোলা ইলিশা ঘাট ভাড়া নিবে ১৫০ টাকা করে আর যদি ফেরিতে যান ভাড়া নিবে ৮০ টাকা ।তবে লঞ্চে সময় লাগবে১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট আর ফেরিতে ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।ফেরিতে না যাওয়াই ভালো।আর সার্বক্ষণিক স্পিড বোট রয়েছে ভাড়া জনপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা নিবে ইলিশ ঘাট যাওয়ার পর ঘাটেই বাস পাবেন চর ফ্যাশন এর। ভাড়া নিবে জন প্রতি ২০০-২৫০ টাকা।এই গাড়িতে যাওয়ার পর আপনাদেরকে চর ফ্যাশন নামিয়ে দিবে এর পর বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ আইচা এর বাসে উঠে যাবেন। উপড়ের প্ল্যান মতো করে আইচা চলে যাবেন।
থাকা:কুকরি যাওয়ার পর যদি প্ল্যান থাকে ওখানে থাকবেন তাহলে দুইটা অপশন রয়েছে একটা হচ্ছে হোমস্টে আরেক টা তাবুতে।হোমস্টে যেকোন সময় গেলে পাবেন তবে তাবু শুধু সিজনে মানে শুধূ শিতের সময় পাবেন।হোমস্টে ভাড়া শুরু জনপ্রতি ২০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত ,সিজনে চাহিদা অনুযায়ী ভাড়া কম বেশি হতে পারে বাট ৪০০ এর ভিতর পেয়ে যাবেন।
কুকরি তে এখন প্রতিটা বাড়িতে থাকায় ব্যাবস্থা রয়েছে, ট্যুরিস্ট দের জন্য আলাদা আলাদা বাড়ি করা হয়েছে এবং বাড়ি গুলো খুব সাজানো গোছানো। আর যারা তাবুতে থাকবেন তাবু ভাড়া জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পরবে।
খাবার: যদি হোমস্টে বা বাড়িতে থাকেন তাহলে তাদের বললে হবে তারা আপনাদের চাহিদা অনুযায়ী খাবার রান্না করে দিবে তবে সে ক্ষেত্রে আপনারা বাজার করে দিবেন না হয় তাদের লিস্ট দিলে তারা বাজার করে রান্না করে দিবে বাজারের টাকা নগদ দিতে হবে আর রান্না বা সব কিছু রেডি করে দেওয়ার জন্য আপনাদের ইচ্ছে মতো তাদের যা দিবেন সেটাই নিবে ,সেখানে নির্ধারিত কোন চার্জ নেই সেম তাবুতেও যা খাবেন বাজার করে দিবেন তারা রান্না করে দিবে পরে খুশি হয়ে যা দেন।
ববর্তমানে কুকরী পর্যটক বান্ধব করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন জোরালো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে তাই যারা সেখানে ঘুরতে যাবেন কোন প্রকার ঝামেলা ছাড়া নির্দ্বিধায় যে কোন স্থানে যেতে পারবেন, কেউ যদি কোন প্রকার সমস্যা করে তাহলে স্থানীয় চেয়ারম্যান কে জানালে সাথে সাথে তার সমাধান পাবেন।
কুকরীর সকল মানুষ খুবই আন্তরীক। পর্যটক আকর্ষণ করার জন্য নারিকেল বাগান এর ওখানে ছাউনী,ওয়াচ টাওয়ার, নদীতে নামার জন্য ঘাট, বাগানের ভিতরে রাস্তা,সেমি পাকা ওয়াশ রুম,এছাড়া বাকি যত গুলো স্থান রয়েছে সব গুলোতে বসার জন্য সুব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।এছাড়াও কিছু দিন আগে ঝুলন্ত ব্রিজ করা হয়েছে,এছাড়াও কুকরী এর চার পাশে বেরি বাঁধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সম্পুন বেরি বাঁধ পাকা রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে বাইক বা অটো নিয়ে পুরো কুকরী ঘুরে দেখা যাবে। বর্তমানের সম্পূর্ণ কুকরিতে বিদ্যুৎ সেবা রয়েছে।বলে রাখা ভালো সেখানে শুধু মাত্র গ্রামীণ সিমের নেটওয়ার্ক ভালো কাজ করে অন্য কোম্পানির নেটওয়ার্ক ভালো না।
ভোলা অবথা কুকরি নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাকে জানাতে পারেন যতটুকু পারি হেল্প করবো।





